মরুভূমির কাঁটাময় উদ্ভিদ আর রঙিন ফুলের অপূর্ব মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে এক স্বপ্নরাজ্য। যেখানে সারি সারি ক্যাকটাসের মাঝখানে ফুটে থাকা অ্যাডেনিয়ামের রঙিন ফুল মুহূর্তেই মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের। মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার রায়পুর গ্রামের প্রকৌশলী খুরশিদ আলম সোহাগ নিজের বাড়ির আঙিনায় গড়ে তুলেছেন এমনই এক ব্যতিক্রমী ‘গ্রিন শেড’, যা এখন স্থানীয়দের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
প্রকৌশলী খুরশিদ আলম সোহাগ, পেশাগত জীবনে তিনি অবকাঠামো নির্মাণ ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজে ব্যস্ত থাকলেও, তার হৃদয়ের বড় একটি জায়গাজুড়ে রয়েছে ক্যাকটাস ও অ্যাডেনিয়ামের প্রতি গভীর ভালোবাসা। ২০০৮ সালে শখের বশে কয়েকটি গাছ সংগ্রহের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার এই যাত্রা। এরপর প্রায় দেড় যুগের নিরলস পরিশ্রম, সংগ্রহ আর পরিচর্যায় তিনি গড়ে তুলেছেন হাজারো বিরল প্রজাতির উদ্ভিদের এক বিশাল ভান্ডার।
বর্তমানে তার সংগ্রহে রয়েছে ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার ক্যাকটাস ও অ্যাডেনিয়ামের চারা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বিরল প্রজাতির বীজ ও চারা সংগ্রহ করেছেন তিনি। ঢাকা, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, যশোর, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা এসব গাছ এখন তার শেডকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
বাগানে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে নান্দনিকভাবে সাজানো অসংখ্য ক্যাকটাস। লেমন ক্যাকটাস, ফিসহুক, ফেইরি ক্যাসেল, বানি ভ্যারাইটি, ভেরিগেটেড জিম্মো ও এয়ার প্লান্টসহ রয়েছে নানা প্রজাতির সংগ্রহ। কোনোটি স্থাপত্যশিল্পের মতো জ্যামিতিক গঠনে তৈরি, আবার কোনোটি নরম সাদা রোঁয়ায় মোড়ানো। শৌখিন মানুষের কাছে এসব ক্যাকটাস এখন ঘর সাজানোর জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
তবে বাগানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অ্যাডেনিয়াম বা মরুর গোলাপ। রঙিন ডাবল পেটাল ও সিঙ্গেল পেটালের ফুলে ভরে উঠলে পুরো পরিবেশ যেন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বড় কডেক্সযুক্ত অ্যাডেনিয়ামগুলো দেখতে অনেকটা বনসাইয়ের মতো, যা সংগ্রহ করতে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসেন।
৩২ বছর বয়সী প্রকৌশলী খুরশিদ আলম সোহাগ প্রতিদিন ভোরে নিজের বাগানের পরিচর্যা দিয়ে দিন শুরু করেন। তার কাছে প্রতিটি গাছ যেন পরিবারের সদস্যের মতো। তিনি বলেন, “প্রতিটি গাছের আলাদা যত্ন লাগে। কোন গাছে কতটুকু পানি দরকার, কোনটার মাটি পরিবর্তন করতে হবে কিংবা কোনটায় ওষুধ দিতে হবে, সবই আমি নিজে দেখি। দিনের কাজের চাপ যতই থাকুক, সকালে বাগানে এলেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।”
শুরুটা শুধুই শখের হলেও এখন তা ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক রূপ নিতে শুরু করেছে। প্রতিদিনই অনেক মানুষ তার এই গ্রিন শেড দেখতে আসছেন। অনেকে বাড়ির বারান্দা কিংবা ডাইনিং স্পেস সাজানোর জন্য তার কাছ থেকে চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। সোহাগ জানান, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এই উদ্যোগকে এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
তিনি বলেন, “শখ যদি এক সময় কর্মসংস্থান ও আয়ের পথ তৈরি করে, তাহলে তার চেয়ে আনন্দের কিছু হতে পারে না। আমি চাই এই উদ্যোগ আরও বড় হোক এবং নতুনদেরও অনুপ্রাণিত করুক।”
স্থানীয়দের মতে, প্রকৌশলী খুরশিদ আলম সোহাগের এই উদ্যোগ তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিতে পারে। বাড়ির ছোট্ট পরিত্যক্ত জায়গাকেও যে পরিকল্পনা ও ভালোবাসা দিয়ে দৃষ্টিনন্দন এবং লাভজনক বাগানে রূপ দেয়া সম্ভব, তার উজ্জ্বল উদাহরণ এই গ্রিন শেড।
প্রকৌশলীর মেধা আর প্রকৃতির সৌন্দর্যের মেলবন্ধন যেন রায়পুর গ্রামের মাটিতে সৃষ্টি করেছে নতুন এক শিল্পভুবন। যেখানে কাঁটাও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে ওঠে, আর মরুভূমির ফুল বাংলার প্রকৃতিতে এনে দেয় নতুন আবহ।
কালের সমাজ/কে.পি

