ঢাকা রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

মহম্মদপুরে মধুমতির করাল গ্রাসে ভাঙছে ঘর-স্বপ্ন

এস আর এ হান্নান, মহম্মদপুর (মাগুরা) | সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম মহম্মদপুরে মধুমতির করাল গ্রাসে ভাঙছে ঘর-স্বপ্ন

নতুন ঘরের স্বপ্নে ইটের গাঁথুনি তুলেছিলেন শাহিদুল ও হালিমা দম্পতি। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসারটি নতুন করে সাজাবেন; এমনই ছিল তাদের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন মধুমতির ভাঙনের মুখে। নদী এগিয়ে আসায় ঘরের পোতা থেকে একে একে ইট খুলে সরিয়ে নিতে হচ্ছে তাদের। শাহিদুল একা নন। একই পরিণতির শিকার তার দুই ভাই সরোয়ার মোল্যা ও শফিকুল ইসলাম। তারা মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার জাঙ্গালীয়া গ্রামের আক্কাচ মোল্যার ছেলে। ইতোমধ্যে সরোয়ারের একটি ঘর ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের একেবারে কাছে শাহিদুল ও শফিকুলের বসতঘর। ভাঙন ঠেকাতে পরিবারের সদস্যরা নদীর পাড়ে গাছের ডালপালা ফেলে কোনোভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তবে তাদের সেই চেষ্টায় অচিরেই থাবা বসাবে রাক্ষুসে মধুমতি। শফিকুলের স্ত্রী সুরমা খাতুন ও শাহিদুলের স্ত্রী হালিমা খাতুনের কণ্ঠে কেবলই হতাশা। তারা বলেন, “মধুমতি আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। এখন খোলা মাঠে বা গাছতলায় থাকতে হবে।”
 

শুধু এই তিন পরিবার নয়, মধুমতির পাড়ের অসংখ্য পরিবারের গল্প এখন প্রায় একই। কয়েকবার ঘরবাড়ি সরিয়ে অনেকেই নিঃস্ব। নতুন করে ঘর তোলার জায়গা ও সামর্থ্য নেই অনেকেরই। শনি ও রোববার সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাঙনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নদীপাড়ের মানুষ ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরিয়ে নিচ্ছেন। কোথাও বসতভিটার মাটি ধসে পড়ছে, কোথাও নদীতে ঝুলে আছে গাছের শেকড়। সামনে নদী, পেছনে অনিশ্চয়তা; এভাবেই নির্ঘুম রাত কাটছে বহু পরিবারের। টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে গত এক মাস ধরে মাগুরার মহম্মদপুরে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে মধুমতি নদীর তান্ডব। জোয়ার-ভাটার টানাটানিতে প্রতিনিয়তই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি, বৃক্ষরাজি ও একের পর এক বসতভিটা।  শনি ও রোববার সরেজিমন ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার চুড়ারগাতি, চরগয়াশপুর, কাশীপুর, বসুরধুলজুড়ী, ভোলানাথপুর, রুইজানী, গোপালনগর, জাঙ্গালীয়া, ধুপুড়িয়া, রায়পাশা, চরপাচুড়িয়া, হরেকৃষ্ণপুর, আড়মাঝি, ঝামা, দেউলি এবং কালীশংকরপুর গ্রামে মধুমতির ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চুড়ারগাতি, চরগয়াশপুর, বসুরধুলজুড়ী, ভোলানাথপুর,  জাঙ্গালীয়া, হরেকৃষ্ণপুর, ঝামা এবং দেউলী এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেশি দেখা দিয়েছে। নদী ভাঙনের কবলে পড়ে একাধিকবার বসতবাড়ি সরাতে গিয়ে নি:স্ব হচ্ছেন অনেকে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম আসলেই আতঙ্কে থাকেন নদী তীরবর্তী শত শত পরিবারের সদস্যরা। নদী তীরবর্তী বহূ পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তা আর ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। শুধু বসতবাড়িই নয়; হুমকি ও ঝুঁকির মুখে রয়েছে চুড়ারগাতি মৌজার চরগয়াশপুর গ্রামের মসজিদ, ঝামা গ্রামের মসজিদ, গোরস্তান ও ভোলানাথপুর গ্রামের কালী মন্দির, বহূ বসতবাড়ি এবং শত শত একর আবাদি জমি। জানা যায়, দীর্ঘ চার যুগরেও বেশি সময় ধরে মধুমতির অব্যাহত ভাঙনে বদলে যাচ্ছে মহম্মদপুরের ভূচিত্র।
 

গোপালনগর থেকে কাশিপুর পর্যন্ত এবং ঝামা থেকে হরেকৃষ্ণপুর-আড়মাঝি পর্যন্ত নদীর মাঝ বরাবর সুবিশাল চর জেগে ওঠায় পানির স্বাভাবিক স্রোতপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে চরে ধাক্কা খেয়ে প্রবল বেগে উত্তাল ঢেউ সরাসরি এসে আছড়ে পড়ছে লোকালয়ের তীরের ওপর। এর ফলে এসব এলাকায় অন্যান্য এলাকার তুলনায় ভাঙনের তীব্রতা বেশি।
 

কোথাও বসতভিটার মাটি ধসে পড়ছে, কোথাও নদীতে ঝুলে আছে গাছের শেকড়। সামনে নদী, পেছনে অনিশ্চয়তা; এভাবেই নির্ঘুম রাত কাটছে বহু পরিবারের। মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী বলেন, “ভাঙনকবলিত ঝুঁকিপূর্ণ কিছু এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় এবং নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয়  ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত অবহিত করা হয়েছে।” তবে নদীপাড়ের নিঃস্ব মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন; সরকারি স্থায়ী উদ্যোগ বাস্তবে রূপ নিতে নিতে কি তাদের শেষ আশ্রয়টুকুও গিলে খাবে প্রমত্তা মধুমতি? এ বিষয়ে মাগুরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) সন্তোষ কর্মকার বলেন, “আমরা ঝামা ও হকেৃষ্ণপুর এলাকায় জিও ব্যাগের মাধ্যমে প্রাথমিক অবস্থায় ভাঙনরোধের চেষ্টা করছি। জনগণের এই দুর্ভোগের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে।”

কালের সমাজ/কে.পি
 

Link copied!