শরতের নীল আকাশ জুড়ে মেঘ-রৌদ্রের মনভোলানো লুকোচুরি খেলা। শান্ত, স্নিগ্ধ এক বিকেলে মৃদুমন্দ বাতাসে দুলছে বারাশিয়া নদীর জলরাশি। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার আঁধারকোঠা এলাকায় বারাশিয়া নদীর কোল ঘেঁষে তৈরি হয় এক অভূতপূর্ব উৎসবমুখর পরিবেশ। হাজারো মানুষের কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে নদীর তীর। আবালবৃদ্ধবনিতা, সব শ্রেণিপেশার মানুষ ছুটে আসেন এক অনন্য ‘কলার ভেলা বাইচ’ উপভোগ করতে।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে নদীর তীরে দর্শক সমাবেশও ক্রমশ বাড়তে থাকে। তুলনামূলকভাবে নারী দর্শকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সবার অপেক্ষমাণ দৃষ্টি ছিল নদীবক্ষে। বিকেল চারটা ৪৫ মিনিটে শুরু হয় কাঙ্খিত কলার ভেলা বাইচ প্রতিযোগিতা।
ছয়টি সুসজ্জিত কলার ভেলা, প্রতিটিতে দুইজন করে মোট ১২জন বাইচার। ভেলাগুলো ভেসে চলে নদীর শান্ত জলে। এই বিচিত্র আয়োজন পুরো এলাকায় সাড়া ফেলে দেয়। অনেক দর্শক এই নস্টালজিক দৃশ্য দেখে যেন ফিরে যান দুরন্ত শৈশবে।

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা গ্রামীণ ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে এই ব্যতিক্রমী প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। আগত হাজারো দর্শক ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা আর উৎসবমুখর পরিবেশে এই ঐতিহ্যবাহী গ্রমাীণ উৎসব উপভোগ করেন। শৈশব যেন ফিরে পায় তার হারানো সোনালী দিন, আর প্রবীণরাও যেন মেতে ওঠেন প্রাণের উৎসবে।
শুধু কী কলার ভেলা বাইচ! এই নদীতেই অনুষ্ঠিত হয় চাড়ি বাইচ ও হাঁস ধরা প্রতিযোগিতা। এছাড়া তৈলাক্ত কলা গাছ বেয়ে ওপরে ওঠার মতো নস্টালজিক প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়। এই উপলক্ষে আঁধারকোঠা নতুন ব্রিজ এলাকায় বসে জমজমাট গ্রামীণ মেলা।
স্থানীয় ৬৪ বছর বয়সী আমিনুর রহমান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘ছোট বেলায় বর্ষাকালে কলা গাছ দিয়ে ভেলা বানিয়ে চালিয়েছি, আনন্দ-উল্লাস করেছি। আজ এখানের এই কলার ভেলা বাইচ দেখে ছোট বেলার স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে।’

আট বছরের শিশু নাফিজা তুলি তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলে, ‘আমার খুবই আনন্দ লাগছে। মনে হচ্ছে আমিও কলার ভেলায় চড়ে ভেসে যাই।’
প্রতিযোগিতা শেষে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠানে সভাপতি, বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি এস. এম. রকিবুল হাসান বলেন, ‘গ্রামীণ জনপদ থেকে হারিয়ে যেতে বসা আমাদের শেকড় সন্ধানী আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে চিরায়ত ঐতিহ্যের সাথে পরিচয়ের পাশাপাশি নির্মল আনন্দ দেয়ার লক্ষ্যে ব্যতিক্রমী এই আয়োজন করা হয়েছে। সব বয়সী মানুষ সবগুলো ইভেন্ট উৎসবমুখর পরিবেশে উপভোগ করেছেন।’
কালের সমাজ/কে.পি

