ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার। এসব অস্ত্র দিয়েই ঘটছে একের পর এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও ব্যক্তিগত শত্রুতাকে কেন্দ্র করে একের পর এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে সম্ভাব্য প্রার্থী, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি-প্রার্থীদের নিরাপত্তার অভাব, ভোটার ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে। এরইমধ্যে ইসলামী চিন্তাবিদ ও বক্তা মুফতি আমির হামজা অভিযোগ করেছেন, তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। একইভাবে আরও ৯টি জেলায় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থীরা জীবন ভয়ে আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো এখন পর্যন্ত নির্বাচন ভণ্ডুল করার মতো বড় রূপ না নিলেও, সেই আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করা না গেলে ভোট হয়ে উঠবে ভীতিকর। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এই নিরাপত্তা সংকটই।
বিশ্লেষকদের এই শঙ্কার মধ্যেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের মাত্রা অতীতের যেকোনো রেকর্ড অতিক্রম করেছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট। নেতারা বলছেন, হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ ও সম্পদ লুটের ঘটনায় তাঁদের সম্প্রদায়ের মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাওয়া ও ভোট দেওয়ার মনোবল হারিয়ে ফেলছেন।
কথা হয় বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের নির্বাহী মহাসচিব পলাশ কান্তি দে এর সঙ্গে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় হুমকি দেওয়া হচ্ছে, অমুককে ভোট না দিলে দেশে থাকতে পারবে না। এখন ভোটের দিন যদি ভোটকেন্দ্রে থেকে এসে দেখি, আমার ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, সম্পদ লুট হয়েছে, তাহলে ভোটকেন্দ্রে যাব কেন? পলাশ কান্তি দে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দেশে বর্তমানে যে হারে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন চলছে, তাতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মঠ, মন্দির, ঘরবাড়ি, প্রতিমা ভাঙচুর, হত্যা এবং নারীদের ওপর নির্যাতন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। ইতিমধ্যে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা ভোটকেন্দ্রে যাওয়া এবং ভোট দেওয়ার মনোবল হারিয়ে ফেলেছেন বলেও মন্তব্য করেছেন পলাশ কান্তি দে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে নির্বাচনের আগেই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ভোটকে কেন্দ্র করে বাড়ছেই অনিশ্চয়তা। এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশের ক্রমবর্ধমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে। এরইমধ্যে খোদ প্রার্থীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। হামলা হয়েছে নেতাকর্মীদের ওপরও। ভোট নিয়ে এই ভীতি দূর করা না গেলে অনিশ্চিত হয়ে পড়বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শুধু নতুন জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই গুলি করে অন্তত চারজনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি ও স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করার ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রার্থী ও কর্মীদের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা এবং মোটরবাইক ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।
সর্বশেষ গতকাল সোমবার মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের দক্ষিণ রাজানগর গ্রামে মা ও মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহতরা হলেন আমেনা বেগম (৩২) ও তাঁর মেয়ে মরিয়ম (৮)। তবে স্থানীয়রা ও পুলিশ জানায়, আমেনা বেগমের স্বামী মিজান মিয়া। তাঁরা নুরুজ্জামান সরকারের বাড়িতে ভাড়া বাসা নিয়ে থাকতেন।
সোমবার সকালে স্থানীয়রা তাঁদের ডাকাডাকি করলে সাড়া না পেয়ে দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে ভেতরে মা ও মেয়ের মরদেহ দেখতে পান। খবর পেয়ে সিরাজদিখান থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। সাভারে ৬ হত্যাকা-ের নৈপথ্যে পুলিশের তদন্ত বেরিয়ে এসেছেন চঞ্চল্যকর তথ্য। ভবঘুরে মশিউর রহমান খান সম্রাট (৩৫) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
সোমবার দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস অ্যান্ড ট্রাফিক) আরাফাতুল ইসলাম সাভার মডেল থানায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগে ১৮ জানুয়ারি দুপুরে সাভার পৌর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তাকৃত মশিউর রহমান খান সম্রাট সাভার পৌর এলাকার ব্যাংক কলোনী মহল্লার মৃত সালামের ছেলে। তিনি সাভারের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। গত সাত মাসে ৬ খুনের পেছেনে সম্রাট জড়িত বলে দাবি পুলিশের।
ঢাকা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল হক গত ১৬ জানুয়ারি চরাইল হাজী বাড়ি জামে মসজিদে এশার নামাজ পড়তে যান। নামাজ শেষে তিনি মুসল্লিদের সঙ্গে সালাম বিনিময় করছিলেন। এ সময় স্থানীয় মুরুব্বিরাও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। সবাই মনোযোগ সহকারে তার কথা শুনছিলেন। এ সময় কালিন্দী ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মোহন পাঁচ ছয় সাত নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কিছু নেতা সহ ভাড়াটিয়া গুণ্ডাদের নিয়ে মসজিদ ঘেরাও করেন। মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করে কর্নেল হক ও তার দলের লোকজনদের সঙ্গে অশালীন ও মারমুখী আচরণ করেন। এ সময় উপস্থিত মুসল্লী এবং স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় কর্নেল হককে নিরাপদে মসজিদের ভেতর থেকে বের করে নিয়ে এসে নিরাপদ আশ্রয় পৌঁছে দেওয়া হয়। কর্নেল হক যে পথে নিরাপদ আশ্রয় চলে যাচ্ছিলেন সেই পথেও তাকে আক্রমণের চেষ্টা চালানো হয়। এসময় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করে।
১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী সালমান ওমরের এক কর্মীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার ঘটনায় নেতৃত্ব দেন স্থানীয় দুই ব্যক্তি। স্থানীয় লোকজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এ কথা জানিয়েছেন। তার বাড়ি উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নের বাকপাড়া রামসিংহপুর গ্রামে। এ ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় তিন নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এর আগে গত ১৩ জানুয়ারি চরদুয়ানী ইউনিয়নের খলিফারহাট চৌরাস্তা এলাকায় জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে সরোয়ার হোসেন ও সেলিম গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় সেলিমের স্ত্রী শাহানাজ পারভীন বাদী হয়ে ১৪ জানুয়ারি পাথরঘাটা থানায় ৫৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। বজলুর রহমান ওই মামলার ৫ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি।
১৬ জানুয়ারি রাত আনুমানিক ১১টার দিকে উপজেলার বদুরপাড়া রাস্তার মাথা এলাকায় চট্টগ্রামের চন্দনাইশে গেজেটধারী জুলাই যোদ্ধা ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা এনসিপির কার্যকরী নির্বাহী সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এবং মঈন উদ্দীন মাহিনের ওপর সশস্ত্র হামলার অভিযোগ উঠেছে। তবে গভীর রাতে চট্টগ্রাম-১৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আলহাজ জসিম উদ্দিন আহমদ তাঁর ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় অভিযোগটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।
গত ১৬ জানুয়ারি বগুড়ার ধুনট উপজেলায় হ্যাঁ ভোটের প্রচারকালে বিএনপির হামলায় জামায়াতের ৭ নেতাকর্মী আহত হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে হ্যাঁ ভোটের প্রচারকালে বিএনপির নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এ হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে উপজেলার এলাঙ্গী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আইয়ুব আলী বলেন, নির্বাচনের প্রচার নিয়ে জামায়াতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা কাটাকাটির ঘটনা ঘটেছে। তাদের ওপর হামলা চালানো কিংবা মারপিটে আহত করার অভিযোগ সঠিক নয়।
গত ৭ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকায় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বিরকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এ ছাড়া ৩১ ডিসেম্বর রাতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মাদক কারবারে বাধা দেওয়ায় ১ ডিসেম্বর জুরাইনে গুলি করে হত্যা করা হয় অটোরিকশা চালক পাপ্পু শেখকে।
৩০ নভেম্বর দুপুরে খুলনায় আদালতের সামনে দুর্বৃত্তরা ফজলে রাব্বি রাজন ও হাসিব হাওলাদার নামে দুই যুবককে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে। ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর পল্লবী সেকশন-১২ এলাকায় একটি হার্ডওয়্যার দোকানের মধ্যে ঢুকে তিনজন দুর্বৃত্ত পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি একটি হত্যা মামলায় হাজিরা দিয়ে আদালতে গিয়েছিলেন। বছরের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ, নরসিংদী ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৮ জন খুনের খবর পাওয়া গেছে।
৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় নিখোঁজের একদিন পর মোহাম্মদ শাহেদ ইসলাম নামে এক ছাত্রের গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই দিন বিকালে নিখোঁজের দুদিন পর গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে সিনথিয়া খানম বৃষ্টি নামে ৭ বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
৫ জানুয়ারি নরসিংদীর পলাশে মনি চক্রবর্তী নামে এক মুদি দোকানিকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। একই দিনে চট্টগ্রামের রাউজান ও যশোরের মনিরামপুরে দুজনকে গুলি করে খুন করা হয়। সেই দিনেই যশোরের মনিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামে এক ব্যবসায়ীকে গুলি ও ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর আগে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার করালি নওশবা গ্রামে বাসায় ঢুকে সোহেল রানা নামে এক যুবককে গুলি চালিয়ে হত্যা করে দুবৃর্ত্তরা। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে নিখোঁজের দুদিন পর পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী আয়েশা মনির বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ছাড়া শনিবার যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
৯ জেলায় প্রার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে নিষিদ্ধঘোষিত বিভিন্ন চরমপন্থী সংগঠনের সন্ত্রাসীরা। এরইমধ্যে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকা সংগঠনের সদস্যরা প্রকাশ্যে চলে এসেছে। এতে সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ। সাম্প্রতিক কয়েকটি খুনের পেছনেও নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনগুলোর সদস্যদের সরাসরি সম্পৃক্ততা মিলেছে। ভোটের ময়দানে প্রার্থীদের পক্ষ নিয়েও চরমপন্থীদের মাঠে নামার আশঙ্কা রয়েছে, যা আতঙ্কিত করে তুলছে সাধারণ ভোটারদের।
সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ইতোমধ্যে বিষয়টি আমলে নিয়ে র্যাব-পুলিশ চরমপন্থীদের তালিকা নিয়ে মাঠে নেমেছে বলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হত্যাসহ অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মাঠে নামানো হয় গোয়েন্দাদের। তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসেÑনাটোর, পাবনা, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, সাতক্ষীরা ও বরিশাল জেলায় হঠাৎ চরমপন্থী গ্রুপের সদস্যদের তৎপরতা বেড়েছে। তারা ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর এলাকায় ফিরে পুরাতন রূপে চলাফেরা শুরু করেছে। এর মাঝে অনেকে রাজনৈতিক আশ্রয়ও বাগিয়ে নিয়েছেন। এ কারণে স্থানীয়রা তাদের সমীহ করে চলতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার কিছু জায়গায় চরমপন্থীরা পুরনো শত্রুদেরও হুমকি-ধমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ত্রিবেণী ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর শ্মশানঘাট এলাকার হানিফ আলী, লিটন হোসেন ও রাইসুল ইসলামকে খুন করে আলোচনায় আসে চরমপন্থী গ্রুপের সদস্যরা। এরপর হত্যার দায় স্বীকার করে ‘জাসদ গণবাহিনীর কালু’ পরিচয় দিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠানো হয়। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় দাবি করা হয়, এতদ্বারা ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনাবাসীর উদ্দেশে জানানো যাইতেছে যে, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি নামধারী কুখ্যাত ডাকাত বাহিনীর শীর্ষ নেতা অসংখ্য খুন, গুম, দখলদারি, ডাকাতি, ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হরিণাকুন্ডু নিবাসী মো. হানিফ তার দুই সহযোগীসহ জাসদ গণবাহিনীর সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন। তাদের লাশ রামচন্দ্রপুর ও পিয়ারপুর ক্যানালের পাশে রাখা আছে। অত্র অঞ্চলের হানিফের সহযোগীদের শুধরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। অন্যথায় আপনাদের একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। কালু জাসদ গণবাহিনী।
এরপর থেকেই পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, হকগ্রুগ ও লাল পতাকার সদস্যরা এক হয়ে প্রতিশোধের নেশায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। যদিও অপরাধীরা ঘটনা ঘটিয়ে পাশের একটি দেশে চলে যায় বলে তদন্তে উঠে আসে। তবে তাদের অনেক সহযোগী এখন মাগুরা ও যশোরের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে আছেন। সম্প্রতি যশোর বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনের খুনের ঘটনায় তারই জামাতা বাসেদ আলীকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে ভাড়াটে খুনি হিসেবে আসাবুল ইসলাম সাগর নামে এক চরমপন্থীর নাম। জানা যায়, আসাবুল ইসলাম সাগর একসময় ‘হক’ গ্রুপের হয়ে কাজ করত। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর এলাকায় ফিরে এসে হক গ্রুপকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিল।
এছাড়া পাবনা জেলার ঈশ্বরদীতেও চর ও বালুমহাল দখলে চরমপন্থী ক্যাডারদের অস্ত্রের মহড়ার অভিযোগ উঠেছে। সাতক্ষীরা জেলায় ঘের দখলে চরমপন্থী গ্রুপের নেতা শৈলেনের নাম এসেছে। যদিও শৈলেন বেঁচে আছে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত নয় স্থানীয় পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরে তার ভারতে পলাতক থাকার কথা বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
চরমপন্থী এলাকার কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু চরমপন্থী কারাগার থেকে বের হয়ে এসেছেন। যারা আত্মসমর্পণ করেছিল তাদের অনেকে আবারও পুরনো পেশায় ফিরে গেছেন। এমনকি আনসারে চাকরি পাওয়া সদস্যরাও চাকরি ছেড়ে নানা অপকর্ম করছেন বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। আমরা সতর্ক আছি। চরমপন্থীদের তৎপরতা প্রতিরোধ করতে যা যা করা দরকার পুলিশ তাই করছে ও করবে।
মুফতি আমির হামজাকে হত্যার হুমকির অভিযোগ: বিশিষ্ট ইসলামি বক্তা ও জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মুফতি আমির হামজা গত শনিবার থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি পোস্টে তিনি এই হুমকির কথা জানিয়ে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন। পোস্টে মুফতি আমির হামজা লিখেছেন,একটু জানিয়ে রাখি গতকাল থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি মৃত্যুর জন্য সব সময় প্রস্তুত, ইনশাআল্লাহ। আপনাদের কাছে অনুরোধ রইলো, আমার অনুপস্থিতিতে কুষ্টিয়াতে যেই ইনসাফ কায়েমের লড়াই আমরা শুরু করেছি সেটা প্রতিষ্ঠিত কইরেন এবং আমার ৩ শিশু কন্যা সন্তান কে একটু দেখে রাইখেন। মুফতি আমির হামজা কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ডাবিরাভিটা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওয়াজ-মাহফিলে ইসলামি বক্তব্য প্রচার করে আসছেন। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামী তাকে কুষ্টিয়া-৩ আসনে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০২১ সালে স্বৈরাচারী আওয়ামী শাসনামলে এক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাবাসও করেছেন তিনি।
কথা হয় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা-১২ আসনের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হক এর সঙ্গে। তিনি বলেন, শরিফ হাদি ও মোসাব্বির হত্যাকা-ের পর ভোটার ও প্রার্থীরা আতঙ্কে আছেন। সরকার ও নির্বাচন কমিশন প্রত্যাশিত নিরাপত্তা দিতে পারছে না। মৃত্যুভয় নিয়ে আমাদের মাঠে কাজ করতে হচ্ছে। নির্বাচন সুষ্ঠুও সফল করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে, না হলে এ ধরনের হত্যাকা- ঘটতেই থাকবে বলে জানান তিনি। একইসুরে কথা বলেছেন নোয়াখালী-৫ আসনের বিএনপি প্রার্থী মো. ফখরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, নির্বাচন করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সাহস নিয়ে এগোতে হচ্ছে, তবে আমরা সতর্ক আছি। তবে ভিন্ন কথা বলেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। তিনি জানান, নতুন বছরে ঘটে যাওয়া হত্যাকা-গুলো মূলত চাঁদাবাজি ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে হয়েছে। আইজিপি দাবি করেন, যারা এখন হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে তারা সবাই অপরাধ জগতের। এমনটি দেখানো যাবে না, যারা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তারা হত্যার শিকার হচ্ছেন। একপ্রশ্নের জবাবে তিনি আইজিপি বলেন, টার্গেট কিলিং প্রতিরোধ করা কঠিন হলেও পুলিশ কাজ করছে। তবে বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, টার্গেট কিলিং প্রতিরোধ করা যায় না, এটি ঠিক নয়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো টর্গেট কিলিং প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া এখন প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধ প্রতিরোধের কাজটি এখন অনেক সহজ হয়েছে। তিনি বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। নির্বাচনের আগে-পরে এ ধরনের হত্যাকা- আরও বাড়তে পারে। এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
কালের সমাজ/এসআর


আপনার মতামত লিখুন :