ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

জঙ্গল সলিমপুরে হবে কম্বাইন অপারেশন

নিজস্ব প্রতিবেদক | জানুয়ারি ২০, ২০২৬, ০৮:৩১ পিএম জঙ্গল সলিমপুরে হবে কম্বাইন অপারেশন

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় র‌্যাবের উপসহকারী পরিচালক আবদুল মোতালেব নিহত হয়েছেন। এই ঘটনাকে অত্যন্ত জঘন্য বলে উল্লেখ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, সেখানে সব বাহিনী একত্রিত হয়ে কম্বাইন অপারেশন চালাবে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানান তিনি।

প্রেস সচিব বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে যে কাজটা হয়েছে, খুবই জঘন্য। এটার আমরা নিন্দা জানাই। পরবর্তীকালে এ জায়গায় আরও জোরদারভাবে অভিযান চালানো হবে। সব বাহিনী একত্রিত হয়ে কম্বাইন একটা অপারেশন হবে। যারা যারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন, প্রত্যেককে অ্যারেস্ট করা হবে। এখানে যে যত পাওয়ারফুল লোকই হন না কেন, যারা এটায় ইন্ধন জুগিয়েছেন, আর যারা যুক্ত ছিলেন প্রত্যেককে গ্রেফতার করা হবে। ওখানে আশেপাশে লুট হওয়া যত অস্ত্র আছে, সেগুলো কম্বিং অপারেশনের মাধ্যমেটা উদ্ধারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।

জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয়া হবে : চট্টগ্রামের সীতাকু-ের জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে ওঠা অবৈধ কর্মকা-ের আস্তানা শিগগির আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে- এমন তথ্য জানিয়েছেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) এ কে এম শহিদুর রহমান।

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দুপুর আড়াইটার দিকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় র‌্যাব-৭ এর কার্যালয়ে হামলায় নিহত র‌্যাব কর্মকর্তা নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার জানাজা হয়। জানাজা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। 

র‌্যাব ডিজি বলেন, জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। সেখানে যারা অবৈধভাবে বসবাস করছে এবং যারা অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, খুব শিগগির আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের নির্মূল করা হবে। অবৈধ কর্মকা-ের এই আস্তানা আমরা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবো- এইটুকু কথা আপনাদের দিতে চাই।

হামলায় নিহত র‌্যাব সদস্যকে ‘শহীদ’ উল্লেখ করে এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, সুবেদার মোতালেব শহীদ হয়েছেন। যারা এ ঘটনার জন্য দায়ী, তাদের আমরা অবশ্যই আইনের আওতায় নিয়ে আসবো। বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে যেন তাদের শাস্তি নিশ্চিত হয়, সেটি যে কোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি জানান, ঘটনাটি মামলার আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে এবং বিচারিক রায় কার্যকর হওয়া পর্যন্ত পুরো বিষয়টি র‌্যাব মনিটর করবে।

নিহত র‌্যাব সদস্যের পরিবারের বিষয়ে র‌্যাব ডিজি বলেন, মোতালেবের পরিবার অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে। আমরা কাউকে ফিরিয়ে দিতে পারবো না, তবে তার পরিবারের দায়িত্ব আমরা গ্রহণ করেছি। পরিবারটি যাতে আর্থিক ও সামাজিকভাবে কষ্টে না পড়ে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।

অভিযানকালে গুলি না চালানোর বিষয়ে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী আমাদের আত্মরক্ষার অধিকার ছিল। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং সাধারণ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কায় র‌্যাব সদস্যরা গুলি চালাননি। সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে গুলি চালালে সাধারণ জনগণ আহত বা নিহত হতে পারতো।

র‌্যাবের মহাপরিচালক আরও বলেন, পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হবে, কোথাও কোনো ভুলত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করা হবে। ভবিষ্যতে যেন আরও দক্ষ ও সফলভাবে অভিযান পরিচালনা করা যায়, সে লক্ষ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হামলায় জড়িত কয়েকজনের নাম এরই মধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের অবশ্যই গ্রেফতার করা হবে। র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় আমরা সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করবো। যে কোনো ঝুঁকি নিয়েই হোক, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করবো।

সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় র‌্যাবের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে শিগগির অভিযান পরিচালনা করা হবে। সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে এ যৌথ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল।

তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও এবং মোবাইল ফোনের কল ডাটা পর্যালোচনা চলছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত এজাহার পাওয়া যায়নি। এজাহার পাওয়া মাত্রই মামলা করা হবে। এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল জানান, অভিযানের সময় স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে উচ্ছৃঙ্খল জনতা কয়েকজন র‌্যাব সদস্যকে আটক করে এবং তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। খবর পেয়ে জেলা পুলিশ সুপারসহ অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে র‌্যাব সদস্যদের উদ্ধার করেন। ছিনিয়ে নেয়া অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়।

তিনি আরও বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকা ছিন্নমূল ও বিক্ষিপ্ত জনবসতিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে অভিযান চালানো কঠিন। স্থানীয় বাসিন্দাদের তুলনায় বাইরের এলাকা থেকে আসা মানুষের সংখ্যাই বেশি। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিপুল সংখ্যক জনবল দিয়ে পরিকল্পিত অভিযান চালানো হবে।

এর আগে গতকাল সোমবার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে র‌্যাব-৭ এর নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। এ ঘটনায় আরও তিনজন র‌্যাব সদস্য আহত হন। ঘটনার পরপরই যৌথ বাহিনী এলাকার সব প্রবেশমুখে অবস্থান নেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসে কালো জ্যাকেট পরা র‌্যাব সদস্যরা অভিযানে গেলে মাইকে ঘোষণা দিয়ে কয়েকশ মানুষ জড়ো হয়। এরপর সংঘবদ্ধভাবে র‌্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। ভিডিওতে মাইক্রোবাস ভাঙচুরের দৃশ্যও দেখা যায়।

এর আগে গত সোমবার বিকালে চট্টগ্রাম র‌্যাবের পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নের একটি দল জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযানে যায়। অভিযানের সময় দুর্বৃত্তরা র‌্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে এক র‌্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। এ সময় তিন র‌্যাব সদস্যকে দুর্বৃত্তরা জিম্মি করে রাখে বলে জানানো হয়।

চট্টগ্রাম র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিকালে পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নের একটি দল জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গেলে দুর্বৃত্তরা তাদের ওপর হামলা চালায়। অতর্কিত হামলায় এক র‌্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। এছাড়া দুর্বৃত্তরা র‌্যাবের তিন সদস্যকে জিম্মি করে রেখেছে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। আটকে পড়া সদস্যদের উদ্ধারে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত ফোর্স পাঠানো হয়।

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে গত চার দশক ধরে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এই দখলদারিত্ব ও প্লট বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে এক দুর্র্ধষ সশস্ত্র বাহিনী। এলাকাটিকে বর্তমানে একটি ‘নিষিদ্ধ নগরী’তে পরিণত করা হয়েছে। যেখানে বাসিন্দাদের জন্য রয়েছে বিশেষ পরিচয়পত্র। বহিরাগত তো বটেই, এমনকি পুলিশ বা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রবেশাধিকারও সেখানে নিয়ন্ত্রিত। একাধিকবার অভিযান চালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে। এই অপরাধ সাম্রাজ্যের নেপথ্যে রয়েছে দুটি শক্তিশালী পক্ষ। আলীনগর বহুমুখী সমিতি’র নেতৃত্বে রয়েছেন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ইয়াসিন মিয়া এবং ‘মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’ নিয়ন্ত্রণে রাখছেন কাজী মশিউর ও গাজী সাদেক।

বর্তমানে এই দুই সমিতিতে সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। প্রশাসনের ওপর হামলার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে প্রশাসনের ওপর নারকীয় হামলা চালানো হয়। এতে তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক এবং সীতাকু- থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। সন্ত্রাসীরা ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকেও গুলি চালাতে হয়। এর আগে ২০২২ সালেও একাধিকবার র‌্যাব ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে পাহাড় কাটার সরঞ্জাম জব্দ করা হলেও, তাদের প্রস্থানের পরপরই পুনরায় শুরু হয় প্রকৃতির বুক চিরে মাটি কাটার উৎসব। মূলত প্রবেশমুখে থাকা অতন্দ্র পাহারাদারদের মাধ্যমে সংকেত পেয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আগেভাগেই পাহাড়ের ওপর অবস্থান নেয় এবং অতর্কিত হামলা চালায়, যা উচ্ছেদ অভিযানকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

কালের সমাজ/এসআর

Side banner
Link copied!