মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল মাথায় রেখে আগের ধারা অনুসরণ করেই বছরের প্রথম ছয় মাসের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখানে নীতিসুদ হারে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
মূল্যস্ফীতি কমে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না আসা পর্যন্ত নীতি সুদহার নামিয়ে না আনার আভাস আগ থেকেই ছিল। সবশেষ জানুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয় ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আগের মাস ডিসেম্বরেও যা ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রভাবে চলতি বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও রমজান উপলক্ষ্যে মার্চ মাসেও মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা।
সেই প্রেক্ষাপটে গত তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতির পারদ বেড়ে যাওয়াটা যতটা সম্ভব আগামী দুই মাসেও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জানুয়ারি-জুন মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা ছাড়া বাকি সূচকগুলোতে মুদ্রানীতি সফল হয়েছে। উই ডু এক্সিলেন্ট (আমরা সর্বোচ্চ ভালো করেছি), শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা আশাবাদী এটিও (মূল্যস্ফীতি) কমবে। অর্থনীতির বিশ্ব পূর্বাভাস ও আমাদের অর্থনীতির সামনের দিনগুলোতে আরো ভালো করবে, তাই মূল্যস্ফীতিও কমবে।
একটা লক্ষ্য অর্জিত হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, একটা টার্গেট হয়নি দেখে গুলি ছোড়া ঠিক হবে না। আমরা তাই এই মূহুর্তে পলিসি রেট কমাবো না।
মূল্যস্ফীতি কমে আসার বিষয়ে আশাবাদী গভর্নর বলেন, রিজার্ভ আমাদের ভালো অবস্থানে আছে। গত অগাস্ট থেকে আইএমএফ এর শর্ত অনুযায়ী রিজার্ভ রয়েছে আমাদের। আগে কখনোই যা হয়নি। আমাদের রিজার্ভ বাড়ছে।
সুদহার নীতি বেশি রাখার কারণে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এটা না রাখলে বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকতো না। এর সুবিধা এখন পাচ্ছি আমরা। রেমিট্যান্সসহ বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ছে।
মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নেমে না আসা পর্যন্ত নীতিসুদ হার না কমানোর পরামর্শ দিয়ে রেখেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। গত মুদ্রানীতিতেও সেই সিদ্ধান্ত জানিয়ে রেখেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার আগের মতই অর্থাৎ ১০ শতাংশ করা হয়। আগের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এসএলফ রেট সাড়ে ১১ শতাংশ ঠিক রেখে এসডিএফ হার ৮ শতাংশ থেকে কিছুটা কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রাক্কলন করা হয় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। আগের বার ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রবৃদিধ দেখা দেয় ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাজারে কী পরিমাণ অর্থের সরবরাহ থাকবে, তার সম্ভাব্য পরিকল্পনা মুদ্রানীতিতে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক ছয় মাস অন্তর মুদ্রানীতি ঘোষণা করে।
বছরের বেশি সময় ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি
২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে চলছে। সবশেষ ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসএলফ রেট সাড়ে ১১ শতাংশ ও এসডিএফ ৮ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমতে শুরু করলে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি এক লাফে দুই অংকের ঘরে গিয়ে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে ওঠে। আগের মাস আগস্টেও তা ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে নীতিসুদ হার বাড়াতে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারপরও মূল্যস্ফীতি বাড়তে বাড়তে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ হয়।
ওই মাস থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন পরের মাসে সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হয়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
অন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরোমাত্রায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৪ সালের আগস্টে মূল্যস্ফীতি কমে আসতে শুরু করে। ধাপে ধাপে কমে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসে মূল্যস্ফীতির হার। কিন্তু এরপর টানা তিন মাস বেড়ে জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ হয়েছে।
কালের সমাজ/এসআর


আপনার মতামত লিখুন :