মোটাদাগে বিবেচনা করলে সরকারের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে— প্রথমটি অর্থনৈতিক, দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনের পাশাপাশি দেশে বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরকরাহ নিশ্চিত করা আগামী সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বলা যায়— উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রর কাছে বিপুল পরিমাণ বকেয়া রয়েছে। বিগম আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বছর থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছে বকেয়া জমতে শুরু করে। গত দুই বছরে সেই বকেয়ার পরিমাণ আরও বেড়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত দুই সরকারের রেখে যাওয়া বকেয়া পরিশোধে তাদের ওপর চাপ বাড়বে।
বাংলাদেশে ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (বিপ্পা) সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে তাদের কাছে বকেয়ার পরিমাণ ১৪ হাজার কোটি টাকা। তারা বলছে, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তাদের অন্তত ৬০ ভাগ বকেয়া পরিশোধ করতে হবে। যার পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এছাড়া সরকারের কাছে ভারতের বড় শিল্পগোষ্ঠি আদানি পাওয়ারের ১০০ কোটি ডলার বকেয়া পড়ে রয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটির সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে জানায়, “২০১৫ সালে পিডিবির লোকসানের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বিদ্যুতের উৎপাদন বেড়েছে ৪ গুণ । কিন্তু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দেওয়া টাকার পরিমাণ বেড়েছে ১১ গুণের বেশি। ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বেড়েছে ২০ গুণ।”
নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বকেয়া পরিশোধ এবং লোকসান কমিয়ে আনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে তাদেরকে নতুন করে অর্থের যোগান দিতে হবে।
চলতি মাসে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে ২০৩১ সালের শেষ দিকে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। পেট্রোবাংলার হিসাবে চলতি অর্থবছরে দেশে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রতিদিন ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় খনিগুলো দৈনিক ১৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে সরবরাহ দেখানো হয়েছে ১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে প্রতিদিন ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে। যদিও এলএনজি থেকে প্রতিদিন ১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হয় না। সঙ্গত কারণে বাস্তবে এই ঘাটতির পরিমাণ আরও বেশি।
পরিকল্পনায় দেখা যায়, সরবরাহ একই রেখে ২০২৫-২৬ এবং ২০২৬-২৭-এ গ্যাসের চাহিদা প্রথম বছরে দৈনিক ৫০ মিলিয়ন এবং পরের বছর দৈনিক ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট দেখিয়ে চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৩৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ৩৮৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ না বাড়ায় ওই দুই বছরে ঘাটতি দেখানো হয়েছে ৯২৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।
তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে এলএনজি সরবরাহ আর বাড়ছে না। অর্থাৎ ১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুটই থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময়ে ২০২৮-২৯-এ চাহিদা দেখানো হয়েছে ৩৮৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এর পরের বছর দেখানো হয়েছে ৩৯২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে ২০২৮-এ ঘাটতি দেখানো হয়েছে ৮৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট, ২০২৯-এ যা বেড়ে হবে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা বলছে, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে মহেশখালীতে আরও একটি এলএনজি টার্মিনাল সরবরাহ শুরু করবে। তখন এলএনজি সরবরাহ দৈনিক আরও ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়বে। এই সময়ে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ আরও ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট বেড়ে দাঁড়াবে ২০০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। ওই বছর গ্যাসের চাহিদা দেখানো হয়েছে ৩৯৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে ঘাটতি নেমে আসবে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।


আপনার মতামত লিখুন :