ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

জরিপে এগিয়ে বিএনপি আশাবাদী জামায়াত জোটও

বিশেষ প্রতিনিধি | ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৯:২২ পিএম জরিপে এগিয়ে বিএনপি আশাবাদী জামায়াত জোটও

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে উৎসবমুখর নির্বাচন। ইতোমধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে করা হয়েছে বেশ কয়েকটি জরিপ। এসব জরিপ নিয়ে বেশ কয়েকদিন ধরে চলছে নানান হিসাব-নিকাশ। বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি জরিপ চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ও সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাও। মূলত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির রক্ষা এবং যথাযথ নিরাপত্তা ছক প্রণয়নের লক্ষ্যেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জরিপ। এ কারণেই এসব জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। 

তবে একটি গোয়েন্দা সংস্থার জরিপ প্রতিবেদনে বিএনপির এগিয়ে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে নির্বাচনের ভালো ফলাফলের ব্যাপারে আশাবাদী জামায়াত জোটও। এসব জরিপে একইসঙ্গে উঠে এসছে আগামীতে কে হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

এরআগে ত্রয়োদশ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দুইশর বেশি আসনে জয়ের প্রত্যাশা দলটির নীতিনির্ধারকদের। নির্বাচনী বিভিন্ন সমীকরণ বিশ্লেষণ করে বিএনপির হাইকমান্ড মনে করে—সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হলে অন্তত দুইশর বেশি আসনে জয় পাবে দলটি। তাদের মতে, সারা দেশে আসনভিত্তিক প্রার্থী যাচাই-বাছাই এবং জনমত জরিপ শেষে দেখা গেছে, অন্তত ২২০ থেকে ২৩০টি আসনে বিএনপি এককভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে গত সোমবার এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি) তাদের একটি জরিপে জানিয়েছে যে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জিততে পারে ২০৮টি আসন, যা নির্বাচনে দলটির শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট প্রায় ৪৬টি আসনে জয়ের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। রয়টার্সসহ দেশি-বিদেশি প্রভাবশালী গণমাধ্যম ও প্রতিষ্ঠানের জরিপেও বিএনপির বিপুল ব্যবধানে জয়ের সম্ভাবনার আভাস মিলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন পরবর্তীতে ভোটের ফল দেশের স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। শেখ হাসিনার ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর মাসব্যাপী অস্থিরতা ও শিল্প, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস খাতের বিঘ্ন ঘটেছে। ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, মতামত জরিপ অনুযায়ী বিএনপি’র এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভোটারের একাংশ এখনও সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। জেনারেশন জেডের ভোট প্রভাবশালী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্মীয় কারণে নয়, জামায়াতের পরিচ্ছন্ন ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক চিত্র ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হিসাবে কাজ করছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, ভোটাররা দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অবস্থাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন, ধর্মীয় বা প্রতীকী বিষয়ের গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম। তরুণ ভোটাররা আশা করছেন, আগামী সরকার তাদের ভোট ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব বলেন, আগের সময়ে ভোট দেওয়া বা মত প্রকাশ করা কঠিন ছিল। আশা করি নতুন সরকার এই স্বাধীনতা বজায় রাখবে। আন্তর্জাতিক প্রভাবের দিক থেকেও নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার প্রস্থানে ভারতের প্রভাব কমেছে, চীনের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিএনপি ভারতের সাথে আপেক্ষিকভাবে নমনীয় হতে পারে, তবে জামাত-নেতৃত্বাধীন সরকার পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকতে পারে। তবে জামায়াতে ইসলামী দাবি করেছে, তারা কোনো দেশের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও চাপ রয়েছে। ঘনবসতি এবং দারিদ্র্যপূর্ণ দেশ বাংলাদেশে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, দুর্বল বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ও বিনিয়োগ হ্রাসের কারণে ২০২২ সালের পর থেকে বৃহৎ বিদেশি অর্থায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এছাড়া রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনীতি, তরুণ ভোটারের প্রভাব এবং সরকারের স্বচ্ছতা নির্বাচনকে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন শেষে স্থিতিশীল সরকার গঠন দেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

জরিপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বেশ এগিয়ে আছে। বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে হলেও বেশ কয়েকটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ত্রিমুখী এবং চতুর্মুখী লড়াই হবে কোনো কোনো আসনে।

আশাবাদী জামায়াত জোট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলে শতভাগ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। পাতানো নির্বাচন হলে ফলাফল মেনে নেবে না দলটি। কিছু আসনে সিসিটিভি ক্যামেরা কমিয়ে দেওয়ায় নিরাপত্তার আশঙ্কা করছে জামায়াত।

জামায়াত সূত্রে জানা যায়, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট ৩০০ আসনে নির্বাচন করছে। এই জোটে জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া নতুন জেনারেশন জেডের পার্টি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বে দেওয়া কর্নেল (অব.) অলি আহমদের দল এলডিপি, কওমিপন্থী দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ ইসলামপন্থী ও ডানপন্থী দলগুলোকে নিয়ে ১১-দলীয় জোট গঠন করেছে।

২১৫টি আসনে বিএনপি জোটের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে জামায়াতে ইসলামী। বাকি ৮৫টি শরিক দলকে দিয়েছে। এনসিপি ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২২, খেলাফত মজিলস ১২, এলডিপি ৭, এবি পার্টি ৩, নেজামে ইসলাম পার্টি ২, বিডিপি ২টি আসনে নির্বাচন করছে। তবে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও লেবার পার্টি আসন ছাড়াই জোটে রয়েছে।

জোটের নেতারা বলছেন, গত ২০ দিনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর ৪৮টি জেলায় নির্বাচনি প্রচারে সফর করেছেন। এই জেলাগুলোতে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। নারী-পুরুষসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছে। এই গণজোয়ারে বলছে, ১২ তারিখ (ফেব্রুয়ারি) সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিজয় আসবেই। তারা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে আত্মবিশ্বাসী।

তবে নির্বাচনে বিশেষ একটি দলকে অনৈতিক সুবিধা দিতে কিছু আসনে সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে দেওয়ায় শঙ্কাও দেখছেন তারা। নেতাদের অভিযোগ, সিসিটিভি কম থাকায় ওই কেন্দ্রগুলোতে সন্ত্রাস করার আশঙ্কা রয়েছে। কিছু আসনে সুবিধা দিতে পুলিশের বডিওর্ন ক্যামেরা কমানো হয়েছে বলেও মনে করছেন তারা। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের একটি অংশ এখনো নির্দিষ্ট একটি পক্ষকে জেতাতে পক্ষপাতিত্ব করছে। নির্বাচন কমিশনকেও (ইসি) আমাদের কাছে দুর্বল মনে হচ্ছে। আমরা তাদের আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের দাবি জানাচ্ছি।

অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, গত তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে না পেরে হতাশ হয়েছে। ২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন মানুষের আকাঙ্ক্ষার জায়গা। আমরা ১১-দলীয় জোট করেছি। বিপুল সমর্থন প্রত্যাশা করছি। তরুণ, নারীসহ সবার সমর্থন পাচ্ছি। বাস-ট্রেনেও দাঁড়িপাল্লার পক্ষে স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে, নির্ভয়ে সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে আমরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হবো।

তিনি বলেন, এখনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হামলা, মারধর ও ভোট কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের খবর পাচ্ছি। একটি দলের সন্ত্রাসীরা নির্বাচন বানচাল এবং মানুষকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে যেন ভোট কেন্দ্রে না আসে। আমরা এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সহযোগিতা আশা করছি।

তিনি আরো বলেন, জনমনে আতঙ্ক দূর করতে লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে প্রশাসনকে আরো তৎপর হতে হবে। একই সঙ্গে ভোটের মাঠে প্রশাসনকে আরো তৎপর হতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো কঠোর হতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে আরো শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের এই নেতা বলেন, পাতানো নির্বাচনের চেষ্টা করা হলে তা জামায়াত মেনে নেবে না।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড়-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার নওশাদ জমির জয়লাভ করবেন। পঞ্চগড়-২ আসনে জয়লাভ করবেন বিএনপি প্রার্থী ফরহাদ হোসেন আজাদ। তবে তার সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতের প্রার্থী সফিউল আলমের সঙ্গে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে জয়লাভ করবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঠাকুরগাঁও-২ আসনে জয়লাভের সম্ভাবনা আছে জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল হাকিমের। বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর ত্রিমুখী লড়াইয়ের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করতে পারেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী জাহিদুর রহমান জাহিদ। দিনাজপুরের ছয়টি আসনের মধ্য থেকে চারটি আসনেই বিএনপি জয়লাভ করবে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, দিনাজপুর-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি। আর দিনাজপুর-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপির বিদ্রোহী) এ কেএম কামরুজ্জামান বিজয়ী হতে পারেন। নীলফামারীর চারটি আসনের মধ্যে একটি করে আসনে বিএনপি ও জামায়াত নিশ্চিত জয় পারে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, একটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। অপর আসনটিতে ত্রিমুখী লড়াই হবে বিএনপি-জামায়াত ও জাতীয় পার্টির মধ্যে। 

লালমনিরহাটের তিনটি আসনের মধ্যে দুইটি বিএনপির পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। একটিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলা হয়েছে জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে। রংপুরের ছয়টি আসনের মধ্যে তিনটি বিএনপি, দুইটি জামায়াত ও একটিতে জাতীয় পার্টির জয়লাভের সম্ভাবনা আছে। কুড়িগ্রামের চারটি আসনের মধ্যে বিএনপির তিনটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে জানিয়ে বলা হয়, অপর আসনে (কুড়িগ্রাম-১) বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত ও হাত পাখার মধ্যে চতুর্মুখী লড়াই হবে। গাইবান্ধার পাঁচটি আসনের মধ্যে দুইটি করে আসন বিএনপি ও জামায়াত পেতে পারেন। একটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেন। গাইবান্ধার পাঁচটি আসনের বিষয়ে বলা হয়েছে, এখানে দুইটি আসনে বিএনপি এবং একটি আসনে জামায়াত এগিয়ে আছে। একটি আসনে জামায়াত অথবা জাতীয় পার্টির যে কেউ জয়লাভ করতে পারেন। অপর আসনটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর জয়লাভের সুযোগ আছে। জয়পুরহাটের একটি আসনে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে। অপরটিতে বিএনপির প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি।

বগুড়ার সাতটি আসনের বিষয়ে বলা হয়েছে, এখানে ছয়টিতেই বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা আছে। আর একটিতে (বগুড়া-৩) বিএনপি এবং জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। চাপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনের মধ্যে একটিতে বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি। অন্য দুইটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। বলা হয়েছে, নওগাঁর ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিই বিএনপি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। দুইটিতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হড়াই হবে তীব্র। একই অবস্থা রাজশাহী জেলার ছয়টি আসনের ক্ষেত্রেও। নাটোরের চারটি আসনের মধ্যে একটি করে আসন জিততে পারেন জামায়াত, বিএনপি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী। অপরটিতে বিএনপি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে তুমুল।

সিরাজগঞ্জের ছয়টি আসনের সম্ভাব্য ফলাফল হিসেবে বলা হয়েছে চারটি আসনে বিএনপির জয়লাভের সুযোগ বেশি। আর দুইটি আসনে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। পাবনার পাঁচটি আসনের মধ্যে দুইটিতে বিএনপি ও দুইটিতে জামায়াত জয়লাভ করতে পারেন। একটিতে বিএনপির দলীয় এবং বিদোহী প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে। মেহেরপুরের একটি আসন বিএনপি এবং অপরটি জামায়ায়াতের পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কুষ্টিয়ায় বিএনপির দুইটি আসন মোটামুটি নিশ্চিত হলেও দুইটিতে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। 

চুয়াডাঙ্গার দুইটি আসনেই বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা। ঝিনাইদহের চারটি আসনের মধ্যে দুইটি আসনে বিএনপি, একটিতে জামায়াত এবং অন্যটিতে বিএনপি দলীয় বা বিদ্রোহীর প্রার্থীর মধ্যে যে কেউ জয় লাভ করতে পারেন।  যশোরের ছয়টি আসনের মধ্যে তিনটি জামায়াত এবং বিএনপি একটি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। দুইটিতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাডি লড়াই হতে পারে। মাগুরার দুইটি আসন বিএনপি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। নড়াইলে একটি আসন বিএনপি এবং অপরটি জামায়াত পেতে পারে। বাগেরহাটের দুইটি আসন বিএনপি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর দুইটিতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

খুলনার ছয়টির আসনের মধ্যে চারটিতেই বিএনপি এগিয়ে আছে উল্লেখ করে বলা হয়, দুইটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। সাতক্ষীরার চারটি আসনের মধ্যে দুইটিতে জামায়াত জয়লাভ করতে পারে উল্লেখ করে বলা হয়, একটিতে বিএনপি এবং অপরটিতে বিএনপি বা জামায়াতের যে কেউ জয়লাভ করতে পারেন।  

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, বরগুনার একটিতে বিএনপি এবং অপরটিতে বিএনপি বা জামায়াতের যে কেউ জয়লাভ করতে পারেন। পটুয়াখালীর দুইটি আসনে বিএনপি, একটি আসনে বিএনপি অথবা জামায়াত এবং অপরটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেন। ভোলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটি বিএনপি এবং একটি বিএনপি সমর্থিত অথবা জামায়াত সমর্থিত প্রার্তী জয়-লাভ করতে পারেন। বরিশালের ছয়টি এবং ঝালকাঠির দুইটি আসনই বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা আছে। বলা হয়েছে, পিরোজপুরের একটি আসনে জামায়াত, একটিতে বিএনপি এবং অপরটিতে বিএনপি সমর্থিত বা ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের (হাতপাখা) প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেন।

টাঙ্গাইলের আটটি আসনের মধ্যে পাঁচটিই বিএনপি পাবেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাকি তিনটি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেতে পারেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর পাশাপাশি সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীও আছেন। জামালপুরের পাঁচটি আসনের সব কয়টিতেই বিএনপি প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, শেরপুরের একটি আসন বিএনপি এবং অপরটি বিএনপি অথবা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ময়মনসিংহের ১১টি আসনের মধ্যে চারটি আসন বিএনপির মোটামুটি নিশ্চিত। অন্য আসনগুলো বিএনপির বিদ্রোহী পার্থী বা জামায়াতে ইসলামী পেতে পারেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। 

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, নেত্রকোনার চারটি আসনই বিএনপির পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিশোরগঞ্জের ছয়টি আসনের মধ্যে চারটি বিএনপি, একটিতে বিএনপির বিদ্রোহী এবং অপরটিতে বিএনপি অথবা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। মানিকগঞ্জের দুইটি আসন বিএনপি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও একটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেন।

মুন্সীগঞ্জের দুইটি আসনে বিএনপি এবং একটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার সম্ভানা আছে। ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৫টিতেই বিএনপি বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি করে আসন পাবে জামায়াত ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী। দুইটিতে বিএনপি-জামায়াতের এবং একটিতে বিএনপি-খেলাফত মজলিশের তীব্র লড়াই হবে। আরও বলা হয়, গাজীপুর এবং নরসিংদীর পাঁচটি করে আসনেই বিএনপি জয়লাভের সম্ভাবনা আছে। নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপি বিজয়ী হতে পারেন। একটিতে বিএনপি অথবা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সুযোগ আছে। অপরটিতে হবে ত্রিমুখী লড়াই। রাজবাড়ীর দুইটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে বিএনপির। ফরিদপুরের তিনটি আসন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এবং একটি আসন জামায়াত আথবা বিএনপি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। গোপালগঞ্জের একটি আসনে বিএনপি জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি। এখানকার দুইটি আসনের জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে ত্রিমুখী লড়াইয়ের মাধ্যমে। মাদারীপুরের একটি আসনে বিএনপি এবং দুইটি আসনে বিএনপি অথবা দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেন বলে গোয়েন্দাদের ধারণা।

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, শরীয়তপুরের দুইটি আসনে বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা আছে। একটি আসনে বিএনপি অথবা জামায়াতের যে কেউ জয়লাভ করতে পারেন। সুনামগঞ্জের তিনটি বিএনপি, একটিতে জামায়াত এবং অপরটিতে বিএনপি অথবা দলটির বিদ্রোহী প্রাথী বিজয়ী হতে পারেন।

সিলেট জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপির বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা। আর দুইটিতে জামায়াত অথবা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেন। মৌলভীবাজারের দুইটি আসনে বিএনপি জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি। একটি বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপির তীব্র প্রতিযোগিতা ও অন্যটিতে ত্রিমুখী লড়াই হবে। হবিগঞ্জের চারটি আসনে বিএনপির বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। চট্টগ্রাম বিভাগের আসনগুলোর মধ্যে ৩৫টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা বিএনপির। অপরদিকে তিনটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা জামায়াতের। অন্য আসনগুলোর জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে বিএনপি, জামায়াত, বিএনপির বিদ্রোহী বা অন্যান্য প্রার্থীর লড়াইয়ের মাধ্যমে।

নতুন জরিপে উঠে এলো প্রধানমন্ত্রী পদে কে এগিয়ে: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি) নামে একটি সংস্থা সাড়ে ৪১ হাজার মানুষের ওপর জরিপ করেছে। এতে দেখা গেছে, নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় ২০৮টি আসনে জয়লাভ করতে পারে। আর জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাব্য আসন সংখ্যা ৪৬টি। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ৩টি, অন্যান্য দল ৪টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৭টি আসনে জয়ী হতে পারেন। সম্প্রতি রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের থ্রিডি সেমিনার হলে ইএএসডির এ জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়। ইএএসডির দাবি, এবারের নির্বাচন নিয়ে যতগুলো জরিপ হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে তাদের এ জরিপটিই সবচেয়ে বড় নমুনার জরিপ।

জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৬ হাজার ৫৬০ জন পুরুষ, যা মোট সংখ্যার ৬৪% এবং ১৪ হাজার ৯২২ জন নারী, যা মোট সংখ্যার ৩৬%। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮-৩০ বছর এই তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছিল মোট ৩৭.২% এবং ৩১-৫০ বছরবয়সী অংশগ্রহণকারীর  হার ৪৫.২%। যেখানে ৩১-৪০ বছর বয়সী ২৭.৫% এবং ৪১-৫০ বছর বয়সী ১৭.৭%।

জরিপে বলা হয়, নতুন প্রজন্মের এই ব্যাপক অংশগ্রহণ ইঙ্গিত দেয় দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তরুণ সমাজ বর্তমানে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ২১.৯% উত্তরদাতা ছিলেন ব্যবসায়ী; এদের মধ্যে বড় ও মাঝারি ব্যবসায়ী ছিলেন ৫.০% এবং ছোট ব্যবসায়ী ছিলেন ১৬.৯%। পাশাপাশি, কৃষি ও গ্রামীণ শ্রমজীবী খাতে মোট অংশগ্রহণকারী ছিল ১৩.২% অন্যদিকে, গৃহস্থালি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে মোট অংশগ্রহণকারী ছিল ১৯.১%; শিক্ষার্থীদের মোট অংশগ্রহণকারী ছিল ১৪.৫%।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সমর্থন করেছেন সর্বাধিক ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষে মত দিয়েছেন ১৪ শতাংশ আর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের পক্ষে মত দিয়েছেন ২ শতাংশ উত্তরদাতা। এ ছাড়া ১৬ শতাংশ উত্তরদাতা এ বিষয়ে মত প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক বলে জানিয়েছেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সার্বিকভাবে মনে হচ্ছে এবারের নির্বাচন ভালো হবে। কেননা, এবারের নির্বাচনে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স ও কাউন্টার ব্যালেন্স সঠিকভাবে থাকায় তথাকথিত ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা নেই।

তিনি বলেন, অনেক দিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় সবার মধ্যে উদ্বেগ ছিল। তবে এখন পর্যন্ত এবারের নির্বাচনের পরিবেশ ভালো। প্রথম দিকে কিছু ঘটনা ঘটলেও পরে সবাই সংযত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ফলাফল যা-ই হোক, আমরা সবসময় স্বাগত জানিয়েছি। ২০০৮ সালে যখন আমরা ৩০টি আসন পেলাম, তখনো আমরা সংসদে গিয়েছি। আমরা সব নির্বাচনকেই গুরুত্ব সহকারে নিই। প্রতিটি প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে সিরিয়াসলি নিচ্ছি এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা আশাবাদী যে, এবার বিএনপি ল্যান্ডস্লাইড (ভূমিধস বা একচেটিয়া) জয় পাবে।

এ বিষয়ে বিএনপির গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান বলেন, আমরা এবারের নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী। কেননা, আমাদের দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে প্রত্যাবর্তনের পর দিন-রাত নির্বাচনী প্রচারণা ও গণসংযোগ করেছেন। তার নেতৃত্বের প্রতি দেশের মানুষ আস্থাশীল ও আশাবাদী। শুধু তাই নয়, তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের যে আস্থা ও জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তা অভূতপূর্ব। অতএব জনগণ এবারও বিপুল ভোটে ধানের শীষকেই বিজয়ী করবে ইনশাআল্লাহ।

Side banner
Link copied!