ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২
হাসিনার পতনের পর ঐতিহাসিক নির্বাচন

ভোট দিতে প্রস্তুত ৪৪ শতাংশ তরুণ ভোটার

নিজস্ব প্রতিবেদক | ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬, ০২:২২ এএম ভোট দিতে প্রস্তুত ৪৪ শতাংশ তরুণ ভোটার

২০২৪ সালের ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের অবসান হয়। এরপর দেশের নেতৃত্ব নির্ধারণে আজ অনুষ্ঠেয় ঐতিহাসিক নির্বাচনে লাখো বাংলাদেশি তরুণ প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন। দেশের ১২ কোটি ৯০ লাখ ভোটারের মধ্যে ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী ভোটার প্রায় ৪৪ শতাংশ। তাদের অনেকেই বলছেন, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের কঠোর শাসনামলে তারা কখনও ভোট দেননি। হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো ব্যাপক কারচুপি ও বিরোধী দলগুলোর ওপর দমনপীড়ন ও নিষেধাজ্ঞার অভিযোগে বিতর্কিত ছিল।

৩৩ বছর বয়সী ফয়জুল্লাহ ওয়াসিফ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা। এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি ভোট দেননি। কারণ তার মনে হয়েছিল এতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। তার ভাষায়, ভয় আর দুশ্চিন্তার কারণেই আমি যাইনি (ভোট দিতে)। আমার আগ্রহও ছিল না।

তরুণ ভোটারদের এই জনমিতিক ঢেউ রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের প্রচারকৌশল ও বার্তা পুনর্গঠনে বাধ্য করেছে। ডিজিটাল প্রচারণা এখন নির্বাচনী লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফেসবুক ভিডিও থেকে শুরু করে টিকটক রিল- অনলাইন প্রচারণায় দলগুলো বিপুল বিনিয়োগ করেছে।

এই নির্বাচনে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর পরিবর্তে তার শাসনামলে দমনপীড়নের শিকার হওয়া দলগুলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের মিত্ররা এবং দেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আশফাহ বিনতে লতিফ বলেন, তার পিতামাতা তাকে হাসিনার আগের সময়ের নির্বাচনের গল্প শুনিয়েছেন, যখন ভোটের দিন ছিল উৎসবের মতো। লতিফ বলেন, এখন যেহেতু আমরা ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পেরেছি, আমি খুবই উচ্ছ্বসিত।

গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রনেতাদের গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করেছে। লতিফ বলেন, তরুণ ছাত্রনেতাদের কাছ থেকে তিনি আরও বেশি প্রত্যাশা করেছিলেন। তবে পরিবর্তনের আশায় তিনি এখনও আগ্রহী। তার ভাষায়, আমরা চেয়েছিলাম তরুণরাই আমাদের নেতৃত্ব দেবে। আর অনেক দিক থেকে তারা তা করেছে। তারা যদি ব্যর্থ হয়, তবে সেটি সব তরুণেরই ব্যর্থতা।

২০২৪ সালের অস্থিরতার সূচনা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে, যা তাদের দাবি অনুযায়ী চাকরির সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করছিল।

দেড় বছর পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি নাজুক অবস্থায় রয়েছে এবং অনেক স্নাতক তরুণ তাদের প্রথম চাকরি পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলিম বলেন, তিনি তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতি আশা করছেন। তিনি বলেন, এই তরুণ ভোটাররা তাদের বঞ্চনার অনুভূতি নিয়েই ভোটকেন্দ্রে যাবে এবং তারা ভোট দেবে।

৩৫০টি আসনের জন্য প্রায় ২০০০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১৪০০ জনই প্রথমবারের মতো প্রার্থী। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৬০০ জনের বেশি প্রার্থীর বয়স ৪৪ বা তার নিচে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা ওয়াসিফ মনে করেন, নতুন মুখগুলো বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে। তরুণদের ওপর আমাদের আস্থা অনেক এবং আমাদের প্রত্যাশাও অনেক। যেহেতু পরিবর্তন তরুণরাই এনেছে, আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও আমূল পরিবর্তন তাদের মাধ্যমেই আসবে।

লতিফ আশা করেন, এই নির্বাচন আরও গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের সূচনা করবে। এমন একটি সরকার, যারা ভিন্নমতকে শত্রু মনে করবে না, বরং তাদের সম্মান করবে।

জয়-পরাজয়ে ‘জেন-জি’ ফ্যাক্টর!
দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের সমীকরণ বদলে দিতে পারে ‘তরুণ শক্তি’। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা এখন প্রায় পাঁচ কোটি। বিশাল এই জনশক্তিই আগামীর ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রধান ‘কিংমেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত ও সচেতন এই প্রজন্ম প্রার্থীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা এবং স্বচ্ছতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে, যা চূড়ান্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে।

গত ৭ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের আওতাধীন জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের ভোটার তালিকার হিসাব থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

জাতীয় যুবনীতি ২০১৭ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সের সব নাগরিককে ‘যুব’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তবে, নির্বাচন কমিশনের বয়সভিত্তিক উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের সংখ্যাই এখন প্রায় পাঁচ কোটি। মোট ভোটারের একটি বড় অংশ জুড়ে এই তরুণ প্রজন্মের অবস্থান। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং সচেতন এই ভোটাররা যেদিকে ঝুঁকে পড়বেন, ভোটের নাটাই সেদিকেই ঘুরবে। শহর থেকে গ্রাম— সর্বত্রই তরুণ ভোটারদের আধিপত্য বাড়ছে। বিশেষ করে নতুন অন্তর্ভুক্ত হওয়া ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রবল।

ইসির তথ্যমতে, তরুণ ভোটারদের চাওয়া-পাওয়া প্রথাগত রাজনীতির চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। তারা কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। এই পাঁচ কোটি ভোটার যদি ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, তবে যেকোনো রাজনৈতিক দলের ভাগ্য নির্ধারণে তারাই মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন। রাজনৈতিক দলগুলোরও নির্বাচনী ইশতেহারে তরুণদের গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি প্রণয়ন করতে দেখা গেছে। মূলত এই বিশাল জনশক্তিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে নির্বাচনী রণকৌশল।

তরুণ ভোটারদের বিস্তারিত পরিসংখ্যান: ইসির তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটার রয়েছে ২৬ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ক্যাটাগরিতে। প্রায় আড়াই কোটি ভোটারের বয়স ২২ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-১৮-২১ বছর : ৮৫ লাখ ৩১ হাজার ৫৩৮ জন। ২২-২৫ বছর : ১ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার ১০৬ জন। ২৬-২৯ বছর : ১ কোটি ২১ লাখ ৬৬ হাজার ১৬২ জন। ৩০-৩৩ বছর : ১ কোটি ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৬১৫ জন।

ইসির হিসাব অনুযায়ী, সর্বমোট তরুণ ভোটারের সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটির কাছাকাছি। তরুণদের পাশাপাশি মধ্যবয়সী ও জ্যেষ্ঠ ভোটারদের সংখ্যাও কম নয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৬০ বছরের বেশি বয়সী ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি ৯৩ লাখের বেশি। বয়সভিত্তিক ভোটারের মধ্যে রয়েছে-৩৪-৩৭ বছর বয়সী ভোটার : ১ কোটি ২৩ লাখ ৬ হাজার ৭৫৫ জন। ৩৮-৪১ বছর বয়সী ভোটার : ১ কোটি ৩০ লাখ ২৬ হাজার ৪৫০ জন। ৪২-৪৫ বছর বয়সী ভোটার : ১ কোটি ২৩ লাখ ২৩ হাজার ৪২ জন। ৪৬-৪৯ বছর বয়সী ভোটার : ৯২ লাখ ৩৯ হাজার ৭২৩ জন। ৫০-৫৩ বছর বয়সী ভোটার : ৮০ লাখ ৫৪ হাজার ৫৬০ জন।  ৫৪-৫৭ বছর বয়সী ভোটার : ৬৩ লাখ ৪২ হাজার ২৮ জন। ৫৮-৬০ বছর বয়সী ভোটার : ৫১ লাখ ৮১ হাজার ১০৩ জন। ৬০ বছরের বেশি ভোটার : ১ কোটি ৯৩ লাখ ৫১ হাজার ৯৯৪ জন।

অঞ্চলভিত্তিক ভোটার বিন্যাসে শীর্ষে ঢাকা: ভোটার সংখ্যার দিক থেকে ঢাকা অঞ্চল সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, যা যেকোনো দলের জন্য ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু। অঞ্চলভিত্তিক ভোটার বিন্যাস নিচে তুলে ধরা হলো-ঢাকা অঞ্চল : ১ কোটি ৮৩ লাখ ৪৪ হাজার ৯৬৫ জন। রাজশাহী অঞ্চল : ১ কোটি ৬৩ লাখ ৭৮ হাজার ৮০ জন। ময়মনসিংহ অঞ্চল : ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯ হাজার ২৭১ জন। কুমিল্লা অঞ্চল : ১ কোটি ৫৭ লাখ ৬৮ হাজার ৫০ জন। খুলনা অঞ্চল : ১ কোটি ৪২ লাখ ৩৫ হাজার ৬১০ জন। রংপুর অঞ্চল : ১ কোটি ৪১ লাখ ৮৪ হাজার ১২২ জন। চট্টগ্রাম অঞ্চল : ৯৯ লাখ ১১ হাজার ৩২০ জন। সিলেট অঞ্চল : ৮৪ লাখ ৪৫ হাজার ৮২২ জন। বরিশাল অঞ্চল : ৭৯ লাখ ৮১ হাজার ১২৭ জন। ফরিদপুর অঞ্চল : ৬১ লাখ ৫৩ হাজার ৫২৬ জন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর হবে ঢাকা অঞ্চল এবং পাঁচ কোটি তরুণ ভোটার। যারা এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আস্থায় নিতে পারবে, শেষ হাসি তারাই হাসবে।


কালের সমাজ/এসআর

Side banner
Link copied!