গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে জনগণের জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টির স্তর উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অথচ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে এসে আজ দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত এক চরম নৈরাজ্য, নৈতিক স্খলন এবং কাঠামোগত সহিংসতার আবর্তে নিমজ্জিত।
রোগ নিরাময়ের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে যে হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোর ওপর মানুষ আস্থা রাখার কথা, সেগুলো আজ রূপ নিয়েছে অকালমৃত্যুর এক একটি সুসজ্জিত ফাঁদে। একদিকে দেশজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা হাজার হাজার অবৈধ, লাইসেন্সবিহীন ও মানহীন বেসরকারি চিকিৎসালয়ের রমরমা বাণিজ্য, অন্যদিকে চিকিৎসার নামে চরম অবহেলা, ভুয়া ডিগ্রিধারী চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য, দক্ষ নার্স ও টেকনিশিয়ানের অভাব এবং সর্বোপরি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। বিগত এক বছরের (২০২৫-২০২৬) বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে যে শিউরে ওঠার মতো চিত্র সামনে আসে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের এক গভীর ও পদ্ধতিগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। এই সংকট আজ সাধারণ মানুষের মনে এতটাই তীব্র ক্ষোভ ও অনাস্থার জন্ম দিয়েছে যে, মানুষ এখন চিকিৎসকদের ওপর আস্থা হারিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে, হাসপাতাল ভাঙচুর করছে, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম অবক্ষয়ের লক্ষণ। নতুন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এই অরাজকতা বন্ধে ইদানীং কঠোর অভিযানের কথা বলছেন, কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান সিলগালাও করা হচ্ছে; কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, এই ধরনের সাময়িক ও লোকদেখানো ক্র্যাশ প্রোগ্রাম দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল আনে না। যতক্ষণ না পর্যন্ত এই সংকটের মূলে থাকা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেক্সাস বা দালাল সিন্ডিকেটকে উপড়ে ফেলা যাবে এবং গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে একটি জবাবদিহিমূলক আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই মহাবিপর্যয় থেকে উত্তরণ অসম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিজস্ব এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় অবৈধতার শিকড় কতটা গভীরে প্রবেশ করেছে। গত ২০২৪ সালের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দাপ্তরিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সারাদেশে অন্তত ১,২৮৫টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এবং কোনো প্রকার বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করে আসছে। এই তালিকার ভৌগোলিক বিন্যাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, রাজধানী ও এর আশেপাশের এলাকাগুলোতেই এই অবৈধ বাণিজ্যের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৪১৫টি, এরপরই শিক্ষানগরী ও গ্রামীণ জনপদ পরিবেষ্টিত ময়মনসিংহ বিভাগে ২৫২টি, বাণিজ্যিক ও বন্দর নগরী চট্টগ্রামে ২৪০টি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনায় ১৫৬টি অবৈধ চিকিৎসা কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেন যে, সরকারি এই খতিয়ান হিমশৈলের দৃশ্যমান চূড়ামাত্র; বাস্তবে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে খোদ রাজধানীর অলিতে-গলিতে গড়ে ওঠা লাইসেন্সবিহীন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এই তালিকার চেয়ে অন্তত তিন থেকে চার গুণ বেশি। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে নতুন সরকারের স্বাস্থ্য নির্দেশনায় যখন একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে ঝটিকা অভিযান শুরু করা হলো, তখন প্রথম তিন দিনেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডজনখানেক নামী-বেনামী প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়। কিন্তু এই অভিযানের ভেতরের সত্যটি অত্যন্ত করুণ। দেখা গেছে, সকালবেলা যে ক্লিনিকটি ম্যাজিস্ট্রেট এসে সিলগালা করে যাচ্ছেন, রাতের অন্ধকারে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও দুর্নীতিবাজ স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের অলিখিত জোগসাজশে সেই সিলগালা ভেঙে আবার রোগী ভর্তি করা হচ্ছে। ফলে এই ধরনের অনিয়মিত ও বিচ্ছিন্ন অভিযান কোনোভাবেই ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা মরণফাঁদগুলোকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারছে না, বরং তা কেবল সাময়িক সময়ের জন্য অপরাধীদের আড়ালে চলে যেতে বাধ্য করছে।
বিগত এক বছরে ভুল চিকিৎসা এবং চিকিৎসার নামে চরম অবহেলার কারণে যতগুলো প্রাণ ঝরে গেছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত খতিয়ান নিলেও গা শিউরে ওঠে। এটি কেবল কোনো পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একেকটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ আর আজীবনের কান্না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১৬ বছরের নববিবাহিত গৃহবধূ মাইশা আক্তারের কথাই ধরা যাক; একটি সাধারণ ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই যেভাবে তার জীবন প্রদীপ নিভে গেল, তার কোনো যৌক্তিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দিতে পারেনি। মাদারীপুরের কে আই হাসপাতালে বিলকিস বেগম নামের এক নারী এসেছিলেন একটি অত্যন্ত সাধারণ ফোঁড়ার অপারেশন করাতে, যা কোনোভাবেই জীবনঘাতী হওয়ার কথা নয়। কিন্তু অদক্ষ সার্জন ও এনেস্থেসিওলজিস্টের ভুলের কারণে ওপারেশন থিয়েটারেই তার মৃত্যু হয়, যার জেরে ক্ষুব্ধ জনতা পুরো হাসপাতাল ভাঙচুর করে। ফেনী অঞ্চলের প্রসূতি লিজার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সন্তান প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে থাকলেও ক্লিনিকে কোনো দক্ষ রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থা বা বিশেষজ্ঞ সার্জন ছিলেন না, যার ফলে চিকিৎসার ন্যূনতম সুযোগ না পেয়ে তাকে অকালে প্রাণ হারাতে হয়। পরবর্তীতে সেই ক্লিনিক সিলগালা করা হলেও লিজার শিশু সন্তানটি তার মাকে আর কোনোদিন ফিরে পাবে না। একইভাবে কুমিল্লার নবীনগরে আহমেদ প্রাইভেট হাসপাতালে প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় যে দৃশ্য আমরা দেখেছি, তা আরও লজ্জাজনক। সেখানে আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে মাত্র ১১ লাখ টাকার বিনিময়ে একটি মানবজীবনকে বিক্রি করে দেয় এবং পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়। সিরাজগঞ্জে অ্যাপেনডিক্সের মতো একটি প্রাথমিক ও সহজ অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে সাবিনা খাতুন নামের এক তরুণীর মৃত্যু, ভোলায় চিকিৎসার অবহেলায় নবজাতকের মৃত্যুর পর ইসলামীয়া মেডিকেল সেন্টারে হামলা, কিংবা বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত নার্সের ভুল ইনজেকশন প্রয়োগের পর দুই রোগীর সমসাময়িক মৃত্যু-এই প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় মানুষের জীবন আজ কতটা সস্তা ও অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। এমনকি রাজধানীর নামকরা আদ্-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা এবং পরবর্তীতে তাদের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত এটিই প্রমাণ করে যে, অরাজকতার এই বিষবৃক্ষ কেবল মফস্বলেই নয়, ঢাকার বড় বড় করপোরেট হাসপাতালেও তার ডালপালা বিস্তার করেছে। রাজশাহী, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, যশোরসহ দেশের এমন কোনো জেলা বা উপজেলা নেই, যেখানে গত এক বছরে ভুল চিকিৎসায় মানুষ মারা যায়নি।
এইসব লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে যে কারণগুলো কাজ করছে, তা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং ওপেন সিক্রেট। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সিংহভাগেরই নেই কোনো বিএমডিসি নিবন্ধিত স্থায়ী চিকিৎসক, নেই কোনো ডিপ্লোমাধারী প্রশিক্ষিত নার্স। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো এক সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়, আয়া অথবা ওটি বয়রা নিজেদের নামের আগে `ডাক্তার` পদবি বসিয়ে কিংবা অন্য কোনো চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর জালিয়াতি করে দিব্যি জটিল সব অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করছে। তাদের ওপারেশন থিয়েটারগুলোতে নেই কোনো আধুনিক লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, জরুরি অক্সিজেন সিলিন্ডার কিংবা জীবাণুমুক্তকরণের ন্যূনতম যন্ত্রপাতি। এক নোংরা, স্যাঁতসেঁতে এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলছে এই বাণিজ্য। যখনই কোনো ভুল চিকিৎসার কারণে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়, তখন ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ রোগীকে লাইফ সাপোর্টের নামে মৃতদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিয়ে অন্য কোনো বড় হাসপাতালে রেফার করে দেয়, যাতে মৃত্যুর দায় তাদের ওপর না বর্তায়। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজনরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন, হাসপাতাল ভাঙচুর হয়, গণমাধ্যমে দুই-তিন দিন লেখালেখি হয় এবং পুলিশ এসে একটি অপমৃত্যুর মামলা বা বড়জোর একটি অবহেলার মামলা দায়ের করে। কিন্তু দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা এবং আইনের ফাঁকফোকর গলে আসামিরা খুব দ্রুতই জামিনে বেরিয়ে আসে। তার চেয়েও বড় সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে `সালিশি সংস্কৃতি`। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, টাউট ও ক্লিনিক মালিক পক্ষ মিলে ভুক্তভোগী দরিদ্র পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা সামান্য কিছু টাকার লোভ দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করে। টাকার এই অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে যখন একটি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডকে সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন চিকিৎসকদের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও নৈতিকতার জায়গাটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। অপরাধীরা জেনে যায় যে, ভুল চিকিৎসায় মানুষ মরলে বড়জোর কিছু টাকা জরিমানা দিতে হবে, ফাঁসি বা দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড হবে না; আর এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই নতুন নতুন অপরাধী ও ভুয়া ডাক্তার তৈরিতে জ্বালানি জোগাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই সামগ্রিক অবক্ষয়ের পেছনে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন। বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. লেনিন চৌধুরী অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এই সংকটের স্বরূপ উন্মোচন করে বলেছেন যে, একটি লাইসেন্সহীন বা মানহীন হাসপাতাল একদিনে গড়ে ওঠে না। হাসপাতাল বা ক্লিনিকের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে অতীতে যে চরম রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, ঘুষ ও অনিয়ম হয়েছে, তা সবার আগে খতিয়ে দেখতে হবে। যারা একটি নিরাময় কেন্দ্র খোলার আবেদন করছেন, তাদের নৈতিক ও পেশাগত পটভূমি বা ব্যাকগ্রাউন্ড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা দরকার। আমাদের দেশে মুদি দোকান বা চালের আড়ত খোলার মতো করে যেভাবে পুঁজি খাটিয়ে হাসপাতাল খোলার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা অবিলম্বে আইন করে বন্ধ করতে হবে। ভুয়া চিকিৎসকদের কেবল জরিমানা বা কয়েক মাসের জেল দিলে হবে না, তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় নরহত্যার মামলা দায়ের করা উচিত। একই সাথে স্থানীয় প্রশাসন, সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং জনপ্রতিনিধিদের এই তদারকি প্রক্রিয়ার মধ্যে সরাসরি দায়বদ্ধ করতে হবে; যদি কোনো এলাকায় একটি অবৈধ ক্লিনিক চলে, তবে তার দায় ওই এলাকার সিভিল সার্জন এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নিতে হবে। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাতেরুল হক এই সংকটের আরেকটি অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছেন, যা হলো সরকারি হাসপাতালগুলোর তথাকথিত `দালাল সিন্ডিকেট`। দেশের প্রতিটি বড় সরকারি হাসপাতালে গ্রামীণ ও দরিদ্র মানুষ যখন চিকিৎসার জন্য আসে, তখন একদল সুসংগঠিত দালাল, যাদের সাথে হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মচারী ও চিকিৎসকেরও যোগসাজশ থাকে, তারা রোগীদের ভুল বুঝিয়ে, ভয় দেখিয়ে বা কৃত্রিম শয্যা সংকট তৈরি করে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সেই এই সমস্ত নামহীন, অবৈধ বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে চলে পকেট কাটা এবং ভুল চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। এই দালাল চক্রকে সমূলে উৎপাটন না করতে পারলে কেবল প্রাইভেট ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে সুফল পাওয়া যাবে না। পাশাপাশি রোগীদের নিজেদেরও সচেতন হতে হবে, কোনো ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার আগে তার বৈধ লাইসেন্স আছে কি না বা যিনি চিকিৎসা দিচ্ছেন তার বিএমডিসি নিবন্ধন নম্বর সচল কি না, তা যাচাই করার ন্যূনতম নাগরিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
এই ভয়াবহ সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন বা নতুন মেয়াদের সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন যে কঠোর ও আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন, তা সর্বস্তরের মানুষের মনে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে। তিনি বারবার বিভিন্ন ফোরামে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, জনগণের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারও নেই। হাসপাতালের মানদণ্ড ও ন্যূনতম আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বজায় রাখতে যারা ব্যর্থ হবে, তাদের প্রতিষ্ঠান যত বড় বা প্রভাবশালীই হোক না কেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা করে দেওয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক তদবির বা অর্থনৈতিক প্রভাব খাটানো চলবে না। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামীণ ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এই শুদ্ধি অভিযান চালানো হবে বলে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মতো একটি বড় ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের সাহসী সিদ্ধান্তকে তিনি সঠিক এবং একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে অন্য সবাইকে সতর্ক করেছেন। সরকার এখন স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য `ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড` প্রবর্তন, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের জন্য একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডিজিটাল মনিটরিং নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের এই সমস্ত নীতি ও পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং দূরদর্শী; কিন্তু সাধারণ জনগণের প্রশ্ন হলো, এই ধরনের প্রতিশ্রুতি আমরা অতীতেও অনেক মন্ত্রীর মুখে শুনেছি, কিন্তু কিছুদিন পর আমলাতন্ত্রের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আর দুর্নীতির মায়াজালে সেই সমস্ত উদ্যোগ ফাইলবন্দি হয়ে গেছে। বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থান যেন কোনো সাময়িক লোকদেখানো চমক না হয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক নীতিতে পরিণত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
একটি কল্যাণকামী ও আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এই চিকিৎসাসংকট উত্তরণে অবিলম্বে কিছু বৈপ্লবিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। প্রথমত, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং ডিজিটালাইজড করতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় উন্মুক্ত অনলাইন পোর্টাল থাকবে, যেখানে দেশের প্রতিটি অনুমোদিত হাসপাতালের নাম, তাদের সেবার ধরণ, শয্যা সংখ্যা, কর্মরত চিকিৎসকদের তালিকা এবং লাইসেন্সের মেয়াদের তারিখ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে, যেন সাধারণ রোগীরা এক ক্লিকেই যেকোনো হাসপাতালের বৈধতা যাচাই করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে একটি স্থায়ী, স্বাধীন এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন `সারপ্রাইজ ভিজিট টাস্কফোর্স` বা মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, যাদের কাজ হবে কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই বছরজুড়ে দেশের বিভিন্ন ক্লিনিকে ঝটিকা অভিযান চালানো এবং অনিয়ম পেলেই তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করা। তৃতীয়ত, দেশের সকল চিকিৎসক, নার্স ও ওটি টেকনিশিয়ানদের জন্য নিয়মিত রিফ্রেশার্স কোর্স বা আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং বাজারে প্রচলিত সকল জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি ও ঔষধের মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ভুয়া প্র্যাকটিশনার ও জাল সার্টিফিকেটধারীদের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আমূল শক্তিশালী ও আধুনিকায়ন করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে যদি পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক আইসিইউ, সিসিইউ এবং ঔষধের সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, তবে সাধারণ মানুষ কখনোই বাধ্য হয়ে ধার-দেনা করে এই সমস্ত কসাইখানা তুল্য বেসরকারি ক্লিনিকে যাবে না। বেসরকারি খাতের এই সিন্ডিকেট ভাঙার একমাত্র উপায় হলো সরকারি খাতের সেবার মানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। পঞ্চমত, স্বাস্থ্য খাতের ভেতরে জেঁকে বসা সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও কেনাকাটার হরিলুট বন্ধ করতে হবে। প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এই বরাদ্দ যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি বরাদ্দকৃত অর্থের প্রতিটি পয়সা যেন আমলা ও ঠিকাদারদের পকেটে না গিয়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহৃত হয়, তার জন্য একটি স্বাধীন অডিট বা জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
পরিশেষে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসী পণ্য বা বাণিজ্যিক ব্যবসায়ের ক্ষেত্র নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক মানবাধিকার ও একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্তম্ভ। চিকিৎসা নিতে এসে মানুষকে লাশ হয়ে ফিরতে হবে, আর অপরাধীরা টাকার জোরে পার পেয়ে যাবে-একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন রাষ্ট্রে এই বর্বরতা দিনের পর দিন চলতে পারে না। গত এক বছরের রক্তক্ষয়ী ঘটনাবলি ও নিরীহ মানুষের মৃত্যুর মিছিল থেকে আমাদের এই শিক্ষাই নিতে হবে যে, এই সংকট কেবল চিকিৎসা খাতের কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং এটি আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও সামগ্রিক সুশাসনের এক চরম নৈতিক ধস। এই অবৈধ ক্লিনিকগুলোর বিষবৃক্ষ যদি এখনই গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা না যায় এবং ভুল চিকিৎসার প্রতিটি ঘটনাকে `কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড` হিসেবে বিবেচনা করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়া হয়, তবে দেশের সাধারণ মানুষের মন থেকে রাষ্ট্র ও আইনের প্রতি শেষ আস্থাটুকুও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। হাজার হাজার মানুষের এই অকালমৃত্যু কেবল একেকটি পরিবারের ধ্বংস ডেকে আনছে না, বরং এটি আমাদের জাতীয় মানবসম্পদেরও এক অপূরণীয় ক্ষতি করছে। আমরা নতুন সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান এবং গৃহীত সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলোকে পূর্ণভাবে স্বাগত জানাই; কিন্তু একই সাথে হুঁশিয়ার করে দিতে চাই যে, এই উদ্যোগ যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে আটকে কোনো `এককালীন লোকদেখানো ক্র্যাশ প্রোগ্রাম`-এ পরিণত না হয়। জনগণের জীবন নিয়ে আর কোনো আপস, কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ বা অর্থনৈতিক অনুকম্পা প্রদর্শন করার সুযোগ নেই। সময় এসেছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে এই চিকিৎসাসংকটের স্থায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক ও জবাবদিহিমূলক সমাধান নিশ্চিত করার। অন্যথায় ভুল চিকিৎসার এই মরণফাঁদ ও অবৈধ ক্লিনিকের বিষবৃক্ষ আমাদের পুরো জাতির ভবিষ্যৎ ও স্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলবে। মানুষের জীবন রক্ষার চেয়ে বড় কোনো রাজনীতি বা ব্যবসা হতে পারে না-এই সত্যটিই হোক আমাদের আগামী দিনের পথচলার মূল চালিকাশক্তি।
কালের সমাজ/কে.পি

