সোমালিল্যান্ডকে ইসরায়েল স্বীকৃতি দেয়ার পর অঞ্চলটিতে নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। অনেকে মনে করছেন, ইসরায়েল এই স্বীকৃতির মাধ্যমে লোহিত সাগরের ওপারে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতির বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সুযোগ পেতে পারে। তবে এর পাশাপাশি হর্ন অব আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও আরও গুরুত্বপূর্ণ এক শক্তি তুরস্কের সঙ্গেও ইসরায়েলের বিরোধ তৈরি হতে পারে। শুক্রবার (২ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছে মিডল ইস্ট আই।
সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্তের পেছনে তুরস্কের সোমালিয়ায় বাড়তে থাকা সামরিক উপস্থিতি ঠেকানোর প্রয়োজনও ছিল। মুসলিম ও আরব বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ এই সিদ্ধান্তের নিন্দা করেছে।
সোমালিল্যান্ডের রাজধানী হারগেইসার কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিবেশী এলাকায় তুরস্কের ড্রোন ও যুদ্ধবিমান মোতায়েনের জবাবে ইসরায়েলের কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চায় সোমালিল্যান্ড। সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মোহাম্মদ ওসমান ফাদাল বলেন, ‘আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দরকার। মোগাদিশুতে তুরস্কের এফ-১৬ আছে এবং তারা সোমালিয়ায় একটি ড্রোন ঘাঁটি বানাতে চায়। আমরা তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সমর্থন চাই।’
‘মিডল ইস্ট আই’-এর সাংবাদিককে দেয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে হারগেইসার কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা বলেন, তুরস্কের সামরিক সহায়তায় সোমালিয়া যে শক্তি বাড়াচ্ছে, তার মোকাবিলায় ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার কথা ভাবছে সোমালিল্যান্ড।
‘হুতিকে মোকাবিলা’
সোমালিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদিরাহমান হাসান বলেন, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে এত বিতর্কিত একটি কূটনৈতিক চুক্তিতে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলেও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের জড়ানো ছাড়া উপায় ছিল না। আমরা অনেক ভালো ছিলাম। ১৯৯১ সাল থেকে স্বীকৃতির জন্য আরব ও মুসলিম দেশগুলোর কাছে যোগাযোগ করে আসছিলাম। আমাদের এগিয়ে যেতে হয়েছে। ইসরায়েল এখানে একটি সুযোগ দেখতে পেয়েছে। আমরা ইসরায়েলিদের সঙ্গে অংশীদারত্ব করতে পেরে গর্বিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ভালো সেনাবাহিনী আছে, কিন্তু উপকরণ ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে।’ এসব সরঞ্জাম ইসরায়েল সরবরাহ করবে বলে সরকার আশা করছে বলে জানান তিনি।
হারগেইসা পূর্ব আফ্রিকার একটি শান্ত শহর। কংক্রিট ও ঢেউটিনের দোকান, হাতে আঁকা সাইনবোর্ড আর রাস্তার পাশে গাছতলায় আড্ডা- সব মিলিয়ে শহরটির আলাদা পরিবেশ রয়েছে। বিকেলে সোমালি পুরুষেরা উটের দুধ, দারুচিনি, এলাচ ও লবঙ্গ দিয়ে ফুটানো কালো চা পান করেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে জনপ্রিয় নেশাজাতীয় উদ্ভিদ ‘খাত’ও এখানে সর্বত্র দেখা যায়। খাত বিক্রির দোকানগুলো উজ্জ্বল সবুজ রঙে সাজানো থাকে।
স্বীকৃতির কয়েক সপ্তাহ পর সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদিরাহমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহি ও ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের করমর্দনের পোস্টারও হারগেইসার বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে। একই সময়ে শহরের অভিজাতদের একটি অংশ ইসরায়েলপন্থি এক মার্কিন শিক্ষাবিদের সেমিনারেও অংশ নেয়। তবে অনেক সাধারণ সোমালিল্যান্ডবাসী এই সম্পর্ক নিয়ে সন্দিহান। তারপরও ইসরায়েলের স্বীকৃতি ঘোষণার পর রাস্তায় বিক্ষোভের বদলে উদযাপন দেখা যায়।
সোমালিল্যান্ডের এক বাসিন্দা আবদি বলেন, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক করে কোন মুসলিম দেশ আসলে লাভবান হয়েছে, কেউ কি বলতে পারেন? মিসর? জর্ডান? ইসরায়েল তাদের জন্য কিছু করেছে? দেখা যাক।’ তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, অনেক সোমালিল্যান্ডবাসী এই সম্পর্ককে মূলত লাভ-ক্ষতির হিসাবেই দেখছেন।
সোমালিল্যান্ড এডেন উপসাগরের তীরে অবস্থিত। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইসরায়েলের স্বীকৃতির বিনিময়ে সোমালিল্যান্ডের কৌশলগত উপকূলে ইসরায়েলের প্রবেশাধিকার তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে হুতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ করে দেবে। তবে হাসানসহ সোমালিল্যান্ডের অন্য কর্মকর্তারা হুতির বিষয়ে ইসরায়েলের তুলনায় অনেক কম কঠোর অবস্থান প্রকাশ করেছেন।
হাসান বলেন, ‘হুতি আল-শাবাবের মতো সন্ত্রাসী নয়। আমরা এই পরিচয় প্রত্যাখ্যান করি। আমরা ইয়েমেনে সংঘাতের বিপক্ষে। হুতির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।’ সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের যে অভিন্ন শত্রু তৈরি হয়েছে, সেটি মূলত তুরস্ক।
‘তুরস্কের কারণেই ইসরায়েলের উপস্থিতি’
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যর্থ যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা বাড়ছে। সিরিয়াতেও এই বিরোধ তীব্র হচ্ছে। বাশার আল-আসাদের সরকার পতনের পর সেখানে ইসরায়েলের নীতি সম্প্রসারণের দিকে যাচ্ছে বলে সমালোচনা রয়েছে। সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে মোগাদিশুর বিরোধ অবশ্য এর অনেক আগে থেকেই। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, লোহিত সাগরকেন্দ্রিক জোট ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা জটিল হয়ে উঠছে।
অঞ্চলটির সাবেক এক জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন, ইসরায়েল ও তুরস্ক সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু সিরিয়ার দিকে সবার নজর বেশি। হর্ন অব আফ্রিকা তাদের একে অপরকে পরীক্ষা করার জায়গা হতে পারে, কারণ এটি অনেকটা আড়ালে। ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডে আসার বড় একটি কারণ হলো তুরস্ক।’
আমেরিকান শিক্ষাবিদ টম ফারারের শীতল যুদ্ধের সময়কার বই ‘ওয়ার ক্লাউডস ইন দ্য হর্ন অব আফ্রিকা’-তেও এই অঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ চরিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। সে সময় হর্ন অব আফ্রিকা যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিযোগিতার একটি বড় ক্ষেত্র ছিল। তখন সোমালিল্যান্ড ও সোমালিয়া এক রাষ্ট্র ছিল। প্রতিবেশী ইথিওপিয়ার সঙ্গে সোমালিয়ার ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যেই শীতল যুদ্ধের সময় মস্কো মোগাদিশুর বদলে আদ্দিস আবাবাকে সমর্থন করা শুরু করে। এর জবাবে অবস্থান পরিবর্তন করে যুক্তরাষ্ট্রও।
শীতল যুদ্ধের পর থেকেই সোমালিল্যান্ড কার্যত সোমালিয়া থেকে আলাদাভাবে শাসিত হয়ে আসছে। তবে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জটিল হয়েছে। সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ। উপকূলীয় শহর বারবেরায় ইউএই তাদের বিমান ও নৌঘাঁটির পরিধি বাড়াচ্ছে। একই শহরের বাণিজ্যিক বন্দরে দেশটির বড় অংশীদারিত্বও রয়েছে।
ইউএইর সঙ্গে সোমালিল্যান্ডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের অংশীদারত্বও স্বাভাবিক বলে মনে করেন অনেকে। পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ইসরায়েল ও ইউএইর সহযোগিতা আরও বেড়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, যাকে ছোট প্রতিবেশী দেশগুলোর জোটের একটি পাল্টা উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘পরোক্ষ সংঘাতের ক্ষেত্র’
হর্ন অব আফ্রিকায় বাইরের শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন কিছু নয়। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণের জন্য বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্র ছিল। ১৬শ শতকে আজকের সোমালিল্যান্ডের উপকূল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উসমানীয় ও পর্তুগিজদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। পরে উসমানীয়দের জায়গা নেয় খেদিভ শাসিত মিশর। মিশরের অন্য উপনিবেশ সুদানে বিদ্রোহ শুরু হলে তারা অঞ্চলটি ছেড়ে দেয়। এরপর ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয় এবং সোমালিদের বসবাসের অঞ্চল বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
ব্রিটেন আধুনিক সোমালিল্যান্ডে প্রটেক্টরেট প্রতিষ্ঠা করে। ফ্রান্স গালফ অব তাদজুরা এলাকায় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। ইতালি মোগাদিশুকেন্দ্রিক একটি সোমালি উপনিবেশ দখল করে। আর ইথিওপিয়ার ভবিষ্যৎ রাজা মেনেলিক দ্বিতীয় সোমালি অধ্যুষিত আরও একটি অঞ্চল নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। সোমালিল্যান্ড সরকারের উপদেষ্টা আহমেদ মুসে আরব ও মুসলিম দেশগুলোর সমালোচনায় ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, ‘আমরা সোমালিরা মেনেলিকের কাছে ইথিওপিয়ার সোমালি অঞ্চল হারিয়েছি, কারণ মিশর ও তুরস্ক সেখান থেকে সরে গিয়েছিল।’
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তুরস্ক যদি হারগেইসায় আসত, তাহলে কি আরব দেশগুলো তুরস্ককে বয়কট করত?’ সোমালিল্যান্ড এখনো তুরস্কের প্রতি ক্ষুব্ধ, কারণ ইথিওপিয়ার সঙ্গে এমন একটি সমঝোতায় মধ্যস্থতা করেছিল আঙ্কারা, যাতে ইথিওপিয়া সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি না দিলেও বারবেরা বন্দরের প্রবেশাধিকার ও এডেন উপসাগরে তারা সামরিক ঘাঁটি পাওয়ার সুযোগ পায়। ফেব্রুয়ারিতে আদ্দিস আবাবা সফরের সময় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছিলেন, ‘ইসরায়েলের স্বীকৃতি সোমালিল্যান্ড বা হর্ন অব আফ্রিকার জন্য উপকারী নয়।’
‘উপসাগরীয় দেশগুলো তুরস্ককে অনুসরণ করেছে’
সোমালিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাইরের সামরিক ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে তুরস্ক উঠে এসেছে। সম্পর্কটির শুরু ২০১১ সালে। সে বছর ভয়াবহ খরার সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এরদোয়ান দুই দশকের মধ্যে প্রথম অ-আফ্রিকান নেতা হিসেবে সোমালিয়া সফর করেন। এরপর তুরস্ক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে হাসপাতাল ও সড়ক নির্মাণ করে এবং বর্জ্য পরিষ্কারের কাজেও সহায়তা দেয়। সময়ের সঙ্গে দেশটির অর্থনীতি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে তুরস্কের প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। সোমালিয়ায় তুরস্কের সবচেয়ে বড় বিদেশি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। দেশটির সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় রয়েছে বিশাল এক দূতাবাসও।
মুসে বলেন, ‘শীতল যুদ্ধের পর পশ্চিমারা আফ্রিকাকে শুধু সাহায্যের দৃষ্টিতে দেখেছে। তুরস্ক এমন একটি সম্ভাবনাময় কিন্তু অবহেলিত ভূখণ্ড দেখেছে। তারা সাহায্য ও নিরাপত্তাকে একসঙ্গে নিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোও তুরস্ককে অনুসরণ করেছে। আর এক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত ছিল সবার আগে।’
তবে সোমালিল্যান্ডের স্বাধীনতার ইতিহাস আধুনিক তুরস্ক ও উপসাগরীয় দেশগুলোর আগ্রহের অনেক আগের। ১৯৬০ সালে সোমালিল্যান্ড স্বাধীনতা লাভ করে, প্রতিবেশী সোমালিয়ার পাঁচ দিন আগে। শুরু থেকেই দুই অঞ্চলের একীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল অস্বস্তিকর। এর পরিণতিতে ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে সোমালি শাসক মোহাম্মদ সিয়াদ বারে সোমালিল্যান্ডে সামরিক অভিযান চালান।
হারগেইসা ওগো পর্বতমালার উপত্যকায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। পুরোনো উটের কাফেলার শহরটি এখন দ্রুত বাড়তে থাকা নগরীতে পরিণত হয়েছে। লাল ঢেউটিনের ছাদ, বস্তি ও আধুনিক বাড়িঘর শহরের চারপাশের পাহাড়ের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ১৯৮৮ সালের বোমাবর্ষণে সিয়াদ বারে পুরো শহর ধ্বংস করেছিলেন। আজ শহরের একটি যুদ্ধস্মৃতিসৌধে সোভিয়েত আমলের মিগ-১৭ যুদ্ধবিমান সেই ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি বহন করছে।
সোমালিল্যান্ডবাসী বলছে, সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ ধাক্কা থেকে তারা তুলনামূলকভাবে বেঁচে গিয়েছিল। তাদের স্বঘোষিত প্রজাতন্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠী ইসাক গোত্রের হওয়াকেও এর একটি কারণ হিসেবে দেখা হয়। সোমালিরা নিজেদের পরিচয় মূলত গোত্র বা ক্ল্যানের ভিত্তিতে নির্ধারণ করে। প্রধান পাঁচটি সোমালি ক্লান রয়েছে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় সোমালিল্যান্ড আবার স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মোগাদিশুকে ঘিরে নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
মুসে বলেন, ‘বিশ্বশক্তিগুলো মোগাদিশুকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল এবং হারগেইসা সেই হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা পায়। স্বাধীনতা এসেছিল একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের সময়ে। সোমালিল্যান্ড আজ স্বাধীনতা ঘোষণা করলে পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন হতো, কারণ এখন অনেকগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি সক্রিয়।’
দুই দশক ধরে সোমালিল্যান্ডের তুলনামূলক স্থিতিশীলতা ও এমনকি অবাধ নির্বাচনও সোমালিয়ার অস্থিরতার সঙ্গে বড় পার্থক্য তৈরি করেছিল। তবে এই পরিস্থিতি এখন বদলাতে শুরু করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য সোমালিল্যান্ডের প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করতে পারে। সোমালিয়ায় পরিস্থিতিরও কিছু উন্নতি হয়েছে। ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সোমালিয়ার ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ মওকুফ করে। এতে মোগাদিশুর ঋণ-জিডিপি অনুপাত প্রায় শূন্যের কাছে নেমে আসে।
সোমালিয়ায় তুরস্কের সামরিক প্রভাব
সোমালিয়ার পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানেও তুরস্কের প্রভাব বাড়ছে। তুরস্ক সোমালিয়ার কমান্ডোদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে আল-শাবাবের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছে। সেখানে টিবি২ বায়রাকতার ড্রোন, এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ও আতাক আক্রমণকারী হেলিকপ্টারও মোতায়েন করেছে আঙ্কারা।
২০২৪ সালে তুরস্ক সোমালিয়ার নৌবাহিনী গঠন ও প্রশিক্ষণের জন্য ১০ বছরের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। এই চুক্তিতে সোমালিয়ার আঞ্চলিক জলসীমাযার তুরস্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। তবে এই জলসীমার মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয় এমন সোমালিল্যান্ডও রয়েছে। তুরস্ক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিভিন্ন চুক্তি করেছে। সমালোচকেরা বলেন, দুই দেশের শক্তির ভারসাম্য বিবেচনায় কিছু চুক্তিতে আঙ্কারার সুবিধা বেশি।
মোগাদিশুর বন্দর ও বিমানবন্দর পরিচালনার জন্য ২০ বছরের ইজারা নিয়েছে তুরস্ক। সোমালিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভবিষ্যতে পাওয়া সামুদ্রিক সম্পদের ৩০ শতাংশ আয়ও তুরস্ককে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সোমালিয়া। মৎস্য খাতে অবস্থান তৈরি করেছে তুরস্ক এবং তেল অনুসন্ধানও করছে। এই চুক্তি এমন জলসীমায় তুরস্ককে কার্যক্রমের সুযোগ দেয়, যেগুলোকে সোমালিল্যান্ড নিজেদের বলে মনে করে।
নিরাপত্তা জোরদারে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা সোমালিল্যান্ডের জন্য নতুন কিছু নয়। এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের হামলার মুখে পড়লে ইসরায়েল তার এই উপসাগরীয় মিত্রকে রক্ষায় আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠিয়েছিল। তুরস্কের পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রিসও সম্প্রতি ৩৫০ কোটি ডলারের একটি ইসরায়েলি স্তরভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার চুক্তি করেছে।
তবে সোমালিল্যান্ডের জন্য ঝুঁকিও রয়েছে। ইসরায়েলকে সেখানে প্রবেশের সুযোগ দিলে অঞ্চলটি নিজেই হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। এতে হারগেইসা যে স্থিতিশীলতার জন্য গর্ব করে, সেটিও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বর্তমানে সোমালিল্যান্ড এমন এক অঞ্চলে ঘেরা, যেখানে বিভিন্ন যুদ্ধ ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেখা ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে।
ইথিওপিয়ার সঙ্গে ইসরায়েল ও ইউএইর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দেশটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়ছে এবং দাবি করছে, এসব গোষ্ঠীকে মিশর ও ইরিত্রিয়া সমর্থন দিচ্ছে। তবে কায়রো ও আসমারা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে ইথিওপিয়ার সামরিক সম্পর্ক নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন।
অন্যদিকে হুতি ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির আরব উপসাগরীয় দিকের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। হুতির সঙ্গে ইসরায়েলের পুরোনো বিরোধও এখনো বলবৎ। এসবই ইসরায়েলের জন্য হর্ন অব আফ্রিকায় একটি কৌশলগত ঘাঁটি বা প্রবেশদ্বার হয়ে ওঠার সম্ভাব্য ঝুঁকির অংশ। সোমালিল্যান্ডের জন্যও এই ঝুঁকি উদ্বেগের, কারণ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারা ক্রমেই আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছে।
কালের সমাজ/এসআর

