জুলাইয়ের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের যে প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দিয়েছিল, সরকার গঠনের পর তা বাস্তবায়নে এবার কঠোর অবস্থানে নেমেছে দলের হাইকমান্ড। দলের নাম ভাঙিয়ে দখল, চাঁদাবাজি কিংবা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করা হয়েছে ‘হার্ডলাইন’ বা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি।
দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিএনপিতে কোনো অপরাধীর ঠাঁই হবে না। শীর্ষ নেতৃত্বের এই হুঁশিয়ারির প্রথম বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের কঠোর নির্দেশের মধ্য দিয়ে। পাশাপাশি শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে ভেঙে দেওয়া হয় ঢাকা মহানগরী উত্তর বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি।
শীর্ষ নেতৃত্বের এমন বজ্রকঠিন অবস্থানের পেছনের কারণ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদে দলের চিফ হুইপ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম মনি বিস্তারিত ও বিশ্লেষণী বক্তব্য দিয়েছেন নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশনে। তার বক্তব্যের আলোকে বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক কৌশল ও রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
অনুপ্রবেশকারী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’
গত ১৫-১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা মাঠে ছিলেন, সুবিধাবাদী ও অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকাতে এই শুদ্ধি অভিযান অপরিহার্য ছিল বলে মনে করেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। দলের চিফ হুইপ মণি এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, "আমরা অপরাধকে এক্সেপ্ট করি না। আমরা দখলদারকে পছন্দ করি না, চাঁদাবাজ চাই না। কেউ অপরাধ করুক, সেটা আমরা চাই না।"
তিনি আরও বলেন, "সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ বা দুর্বৃত্তদের কোনো দল নেই। তারা যেখানেই সুযোগ পায়, গভমেন্টে ঢোকার চেষ্টা করে। পানির মতো বিভিন্ন পদ্ধতিতে তারা ঢুকে যায়। তবে এ ব্যাপারে দল অত্যন্ত সচেতন। যারা মানুষের ক্ষতি করে, চাঁদাবাজি করে বা জমি দখল করে, তারা দলে কোনো প্রশ্রয় পাবে না। গত ১৭ বছরে যারা নিরঙ্কুশভাবে দলের সাথে ছিলেন, তারেক রহমান তাদের মূল্যায়ন করতে বদ্ধপরিকর।"
তারেক রহমানের অনাড়ম্বর জীবন ও জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ
চিফ হুইপ মণি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বকে বাংলাদেশের জন্য ‘আশীর্বাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের চরম দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, "হাসিনা এক বছরে শুধু খাবার অফিস থেকেই ৩৫ কোটি টাকা খেয়েছে। আর এই দেশ থেকে ৩০ লক্ষ কোটি টাকা চুরি করে নিয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাত্র ১৫০ টাকা দিয়ে দুপুরে ভাত খান। উনার গাড়িবহরে মাত্র তিনটি গাড়ি থাকে, এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় কোনো বাড়তি প্রটোকল বা আড়ম্বর থাকে না। তিনি সম্পূর্ণ অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেন।"
সরকার গঠনের মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে তারেক রহমানের নেওয়া জনকল্যাণমুখী কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরে চিফ হুইপ জানান, কেবিনেটের প্রথম বৈঠকেই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এছাড়া আড়াই হাজার টাকা করে ৫০ লক্ষ মানুষকে ফ্যামিলি কার্ড, ২ কোটির বেশি মানুষকে কৃষক কার্ড এবং সহজে চিকিৎসা পেতে হেলথ কার্ড দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন, ২৫ কোটি গাছ লাগানো এবং ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে সরকার।
ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে উত্তরণ ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ
বিগত স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার নিরলস কাজ করছে বলে জানান চিফ হুইপ। তিনি বলেন, "হাসিনা চলে যাওয়ার পর দেশের অর্থনীতিতে হাহাকার হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেই হাহাকারটা নেই—এটাই একটা বিরাট অ্যাচিভমেন্ট। পূর্ববর্তী সরকারের লুটপাটের কারণে যে দেনা তৈরি হয়েছে, আমরা এই পাঁচ মাসেই বিদেশিদের সুদসহ ২ বিলিয়ন (২০৫ কোটি) ডলার পেমেন্ট করেছি।"
উন্নয়নমূলক কাজে সময়ের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, "একটি পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। শিশু জন্মের পর ছয় মাস মায়ের দুধ খায়, এরপর তার দাঁত ওঠে এবং শক্ত খাবার হজম করতে পারে। তেমনি একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, ভঙ্গুর রাজনীতি এবং অস্থিতিশীল দেশ পেয়ে আমরা সেখানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। কোনো গাছ লাগালেই সাথে সাথে ফল পাওয়া যায় না।"
যুগের প্রয়োজনে ‘থ্রি আর’ (3R) মডেল
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্যে উঠে আসা ‘থ্রি আর’ মডেল প্রসঙ্গে চিফ হুইপ এক চমৎকার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দেন। তিনি বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের `থিওরি অব রিলেটিভিটি`-এর উদাহরণ টেনে বলেন, "আইনস্টাইন যখন এই থিওরি আবিষ্কার করেন, তখন পৃথিবী হইচই পড়ে গিয়েছিল। মানুষ যত জ্ঞানী হবে, যত রিসার্চ করবে, তার আউটপুট তত বেটার হবে। মান্ধাতার আমলের সিস্টেম এখন চলবে না।"
তিনি আরও বলেন, "এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং এবং রোবোটিক্সের যুগ। এই যুগে এসে এনালগ সিস্টেমে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। তারেক রহমান সাহেব সেই আধুনিক যুগের প্রয়োজনেই এই `থ্রি আর` সিস্টেম চালুর চেষ্টা করছেন। এটি বাস্তবায়িত হলে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছাতে পারব।"
বিএনপির বর্তমান হাইকমান্ডের এই জিরো টলারেন্স নীতি ও শুদ্ধি অভিযান প্রমাণ করে যে, দলটি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি সুশৃঙ্খল ও জনবান্ধব রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে চাইছে। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর ক্ষমতায় এসে দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দলটির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চিফ হুইপের বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, সরকার এখন যেকোনো মূল্যে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায়। হাইকমান্ডের এমন সিদ্ধান্তে একদিকে যেমন সাধারণ জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরছে, তেমনি স্বস্তি ফিরেছে মাঠপর্যায়ের ত্যাগী তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মাঝেও। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে একটি দক্ষ রাষ্ট্র গঠনে বর্তমান সরকারের এই কঠোর নীতি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কালের সমাজ/কে.পি

