ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

তীর্থযাত্রার প্রস্তুতিতে মসজিদের অংশ অপসারণ, উত্তেজনা

কালের সমাজ ডেস্ক | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ০১:২৫ পিএম তীর্থযাত্রার প্রস্তুতিতে মসজিদের অংশ অপসারণ, উত্তেজনা

ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে ২০২৮ সালের হিন্দু তীর্থযাত্রা সিংহস্থ কুম্ভ মেলার প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে একটি মসজিদের অংশ অপসারণের ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে। রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য শাহী মসজিদের একাংশ সরানোর উদ্যোগের প্রতিবাদে রোববার রাতে শত শত মুসলিম সেখানে জড়ো হন। পরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

উজ্জয়িনী শহরটি মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপাল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে। ক্ষিপরা নদীর তীরে ২০২৮ সালে অনুষ্ঠেয় সিংহস্থ কুম্ভ মেলাকে সামনে রেখে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রশস্ত ও উন্নয়নের কাজ চলছে।

৩০ বছর বয়সী ডিজিটাল মার্কেটিং ব্যবসায়ী জিশান খান জানান, প্রায় দুই মাস আগে বিরোধের সূত্রপাত। সে সময় উজ্জয়িনী পৌরসভা শাহী মসজিদ কর্তৃপক্ষকে একটি নোটিশ দেয়।

খানের ভাষ্য অনুযায়ী, রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য মসজিদের জমি অধিগ্রহণের কথা জানিয়ে ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিজেদের উদ্যোগে স্থাপনার একটি অংশ সরিয়ে নিতে বলা হয়। অন্যথায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

মসজিদ কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়। তবে স্থানীয় হাইকোর্ট আবেদনটি খারিজ করে দিয়ে ২০২৮ সালের তীর্থযাত্রায় বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় অতিরিক্ত জায়গার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে।

খান বলেন, প্রশাসনের যুক্তি ছিল, তীর্থযাত্রার সময় বাইরে থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ উজ্জয়িনীতে আসবেন। ফলে যানজট ও জনসাধারণের চলাচলের সমস্যা এড়াতে রাস্তা প্রশস্ত করা প্রয়োজন।

প্রতিবাদ শুরু হওয়ার পর মসজিদ কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করে। আলোচনার পর প্রশাসন মসজিদের রাস্তার দিকের সাত ফুটের বেশি অংশ অপসারণের আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে প্রায় তিন ফুট অংশ সরানোর বিষয়ে সম্মত হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

তবে রোববার রাতে মসজিদের কাছে বুলডোজার পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হাজার হাজার মানুষ ছত্রী চকে জড়ো হন।

প্রশাসনের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কিছু পোস্টের মাধ্যমে মসজিদটি পুরোপুরি ভেঙে ফেলার গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। এর জেরেই বড় জমায়েত তৈরি হয়।

তবে জিশান খানের দাবি, প্রশাসন তাদের বলেছিল—মসজিদের যে অংশ সরানোর কথা বলা হয়েছে, তা হয় তাদের নিজেদের উদ্যোগে সরাতে হবে, নয়তো প্রশাসনই ব্যবস্থা নেবে।

সোমবার সকালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়লে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে অন্তত এক ডজন মানুষ আহত হন। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়।

একপর্যায়ে মসজিদ কমিটি বুলডোজার দিয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কায় স্থাপনার নির্ধারিত অংশ নিজেরাই সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন সদস্য হাতুড়ি ও রড দিয়ে মসজিদের সংলগ্ন প্ল্যাটফর্মের অংশ ভাঙার কাজ শুরু করেন।

খান বলেন, ‘আমরা নিজের হাতেই এটা ভেঙেছি। এতে আমাদের মনে গভীর আঘাত লেগেছে।’

মঙ্গলবার কর্তৃপক্ষ মসজিদের মিনারের একটি অংশও সরিয়ে নেয় বলে জানান তিনি। তবে মসজিদের মূল ভবনের ভেতরে কোনো কাজ শুরু হয়নি বলে তার দাবি।

উজ্জয়িনি কর্তৃপক্ষ শাহী মসজিদের আশপাশের এলাকা সিল করে দিয়েছে এবং সেখানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়েছে।

এদিকে উজ্জয়িনীর ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতেও বিক্ষোভ হয়েছে। ‘মনিটরিং কমিটি অব ইন্ডিয়ান মুসলিমস’-এর আয়োজনে ওই কর্মসূচিতে কয়েকজন মুসলিম সংসদ সদস্য ও ধর্মীয় নেতা অংশ নেন। সংগঠনটি মসজিদ ও অন্যান্য মুসলিম উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে চলমান বিভিন্ন পদক্ষেপ ও ভাঙচুরের প্রতিবাদ জানায়।

জামায়াতে ইসলামী হিন্দের সভাপতি সৈয়দ সাদাতুল্লাহ হুসাইনি বলেন, বিষয়টি শুধু একটি মসজিদ বা একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো উপাসনালয় ভেঙে ফেলা বা আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত না করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ভারতের বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্যে মুসলিম ধর্মীয় ও সামাজিক স্থাপনা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিরোধ তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, মসজিদ, মাজার, কবরস্থান ও মাদ্রাসার মতো স্থাপনা অবৈধ নির্মাণ বা প্রাচীন হিন্দু স্থাপনার ওপর নির্মিত—এমন দাবি তুলে এসব স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিজেপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। উজ্জয়িনীর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও মধ্যপ্রদেশ বিজেপির দুই মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নয়াদিল্লিভিত্তিক একটি দাতব্য সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা আসিফ মুজতবা বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে অনেকেই এ ধরনের স্থাপনা অপসারণের ঘটনাকে মিলিয়ে দেখেন। তার মতে, মসজিদ, মাদ্রাসা ও মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও মানুষ এসব ঘটনাকে যুক্ত করে দেখছে।

উজ্জয়িনীতে এদিকে শাহী মসজিদকে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার রয়েছে। রাস্তা প্রশস্তকরণ ও ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভ মেলার প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা পরিস্থিতি আরও কতটা প্রভাবিত করবে, তা এখন দেখার বিষয়। -আল জাজিরা

কালের সমাজ/এসআর

Link copied!