ইসরায়েলের দুটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, দেশটির কারারক্ষীদের গুলিতে বন্দি ও আটক ব্যক্তিদের আহত হওয়ার অন্তত ২২টি সাক্ষ্য তারা পেয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ফিলিস্তিনি।
আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস এবং পাবলিক কমিটি অ্যাগেইনস্ট টর্চার ইন ইসরায়েল যৌথভাবে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে।
সংস্থা দুটি জানায়, গত এক বছরে পাওয়া সাক্ষ্যগুলোর বেশির ভাগে বন্দিরা জানিয়েছেন, কারারক্ষীরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছেন। তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, এসব গুলি ছিল রাবার, প্লাস্টিক অথবা স্পঞ্জের তৈরি। মোট ২২টি সাক্ষ্যের মধ্যে ২১টি দিয়েছেন ফিলিস্তিনি বন্দি এবং একটি দিয়েছেন একজন ইহুদি বন্দি।
সাক্ষ্যগুলোতে এমন ঘটনার কথাও উঠে এসেছে, যেখানে কারারক্ষীরা খুব কাছ থেকে এবং বন্দিদের কক্ষের ভেতরে গুলি চালিয়েছেন। ফলে গুলির উৎস থেকে সরে যাওয়া কিংবা আশ্রয় নেয়ার মতো জায়গা পাননি বন্দিরা। প্রতিবেদনটিতে ওফের, গানোত, কেতজিওত, গিলবোয়া, মেগিদ্দো, নিতজান ও এশেলসহ কয়েকটি কারাগার ও আটককেন্দ্রে ঘটে যাওয়া ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জুনে রাবার বুলেটের আঘাতে আহত ৪৫ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি বন্দিকে সোরোকা মেডিকেল সেন্টারে নেয়া হয়। চিকিৎসার নথি অনুযায়ী, তার শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত লাগে, যার মধ্যে অণ্ডকোষও ছিল। ডান অণ্ডকোষ সম্পূর্ণভাবে ফেটে যাওয়ায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেটি অপসারণ করতে হয়।
আরেকটি ঘটনায়, খুব কাছ থেকে গুলি করার ফলে এক বন্দির বাম পা ভেঙে যায়। চিকিৎসার নথিতে নিশ্চিত করা হয়েছে, তাকে সোরোকা মেডিকেল সেন্টারে নেয়া হয়েছিল এবং সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ভাঙা হাড় স্থিতিশীল করা হয়। প্রতিবেদনে পা, পেট, শ্রোণি ও হাতে আঘাত পাওয়ার আরও কয়েকটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বন্দিরা জানিয়েছেন, কারারক্ষীদের অভিযান চলাকালে কিংবা কারাগারের বিভিন্ন অংশ ও কক্ষের ভেতরে তাদের গুলি করা হয়। আহত হওয়ার পর কয়েকজনের চিকিৎসা পরীক্ষা করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার কেউ কেউ জানিয়েছেন, তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হয়নি।
এক সাক্ষ্যে ওফের কারাগারের এক বন্দি জানান, কয়েক মাস ধরে খোসপাঁচড়ার চিকিৎসা না দেয়ার প্রতিবাদে তিনি নিজের কক্ষে ফিরতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এর জবাবে কারারক্ষীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালান এবং তার মাথায় বৈদ্যুতিক শক দেয়ার যন্ত্র ব্যবহার করেন।

ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করার পর সংস্থা দুটি ইসরায়েল সরকারের আইনবিষয়ক উপদেষ্টা এবং ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বন্দিদের বিরুদ্ধে ‘নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গুলি ব্যবহারের’ অবসান ঘটানোর আহ্বান জানায় তারা। একই সঙ্গে, কী ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সেগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়, তা প্রকাশ করারও দাবি জানায় সংস্থা দুটি।
জবাবে ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষ বন্দিদের বিরুদ্ধে ‘কম প্রাণঘাতী উপায়’ ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছে। তবে এসব উপায়ের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে তারা। ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস–ইসরায়েলের বন্দি ও আটক ব্যক্তিবিষয়ক বিভাগের প্রধান মুহান্নাদ আবু ঘোশ বলেন, বন্দিদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর ব্যবহারে ‘নজিরবিহীন বৃদ্ধি’ দেখা গেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব উপায়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার বন্দিদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে এবং তাদের স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে। অন্যদিকে, পাবলিক কমিটি অ্যাগেইনস্ট টর্চার ইন ইসরায়েলের আইন বিভাগের প্রধান আইনজীবী মেরাভ বেন জেভ ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৯ হাজার ৩৫০ ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৫০ জন শিশু এবং ৯০ জন নারী। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এসব কারাগারে ব্যাপক নির্যাতন, অনাহারে রাখা এবং চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ জানিয়েছে। এসব কারণে হেফাজতে থাকা অবস্থায় বহু বন্দির মৃত্যু হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
কালের সমাজ/এসআর

