ঢাকা রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২

ঈদের পর খাদ্য বিভাগে শুদ্ধি অভিযান

স্টাফ রিপোর্টার | মার্চ ১৫, ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম ঈদের পর খাদ্য বিভাগে শুদ্ধি অভিযান

ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আলোচনা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনা খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

সরকারি গুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান-চাল সংগ্রহ, সরঞ্জাম ক্রয় এবং কর্মকর্তাদের বদলি-সব মিলিয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্তরে একটি অস্বচ্ছ ব্যবস্থার অভিযোগ বহুদিনের। বিভিন্ন সময়ে সরকার বদলালেও এই চিত্রের বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে। তবে, নতুন সরকারের শুরুতে পরিস্থিতি ভিন্ন বা কঠোর হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলছে।

রোববার বিকালে এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র।  সূত্র জানিয়েছে, ঈদের পর খাদ্য বিভাগে একটি ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছে।

খাদ্য বিভাগের পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সকাল ৯টায় অফিসে উপস্থিত থাকতে হবে। কিন্তু নিয়ম-নীতিকে তোয়াক্কা না করে খুলনা বিভাগীয় আঞ্চলিক ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদ্বয় অনুপস্থিত থাকছেন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে আসায় খাদ্যমন্ত্রীকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। ইতোমধ্যে মন্ত্রীর নির্দেশে খাদ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে সূত্র জানা গেছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্য বিভাগে শুদ্ধি অভিযান কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় নয়; বরং এটি একটি বড় প্রশাসনিক সংস্কারের সূচনা হতে পারে।

খাদ্য অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যম ও প্রশাসনিক সূত্রে উঠে এসেছে খাদ্য গুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান-চাল সংগ্রহ, পরিবহন ব্যয় এবং সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের খবর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মতে, বিশেষ করে এলএসডি (লোকাল সাপ্লাই ডিপো) গুদামগুলোকে কেন্দ্র করে একটি অঘোষিত অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়েছে। এসব গুদামে দায়িত্ব পেলে খাদ্যশস্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ থাকে। ফলে অনেক কর্মকর্তা এসব পদে যেতে আগ্রহী। বিগত সরকারের আমলে বিশাল টাকার বিনিময়ে বদলি বাণিজ্য হওয়ায় তারই ধারাবাহিকতা নতুন সরকারের আমলেও শুরু করেছিল সেই সিন্ডিকেট। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বদলি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে খাদ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এলএসডি গুদামগুলোতে পদায়নের জন্য অনেক সময় অঘোষিতভাবে অর্থ লেনদেন হয়। অভিযোগ আছে, অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে বদলির নজির রয়েছে বলে গোটা খাদ্য বিভাগে আলোচনায় আছে।

এসব বদলিতে মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বিভাগীয় আঞ্চলিক পর্যায়ে দর হাঁকিয়ে বদলি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি আঞ্চলিক কার্যালয়ে এই ধরনের বদলি বাণিজ্যের ঢের অভিযোগ থাকলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার নজির নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা বিভাগীয় খাদ্য দপ্তরের দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে ঘিরে চলছে তীব্র আলোচনা। তারা হলেন-বিভাগীয় আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ তানভীর হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, শুধু এই দুজনেই নন, তাদের ছত্রছায়ায় থাকা আরও বেশকিছু সুবিধাবাদী কর্মকর্তা এখনও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বহাল তবিয়তে রাজত্ব করছেন।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে ইতোপূর্বে তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। তারা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটাতেন এবং বিনিময়ে বিশাল অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিতেন। তাদের বিরুদ্ধে খাদ্য গুদামে বদলি বাণিজ্য, ধান-চাল সংগ্রহে অনিয়ম এবং সরঞ্জাম ক্রয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী যথাসময়ে অফিসে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তারা তা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে, এসব বিষয়ে মন্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

জানতে চাইলে খাদ্য বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, খাদ্য অধিদপ্তরে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু এবার নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি সরাসরি সরকারের উচ্চপর্যায়ে যাওয়ায় সুষ্ঠু তদন্ত এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, ঈদের পর খাদ্য বিভাগে একটি সমন্বিত শুদ্ধি অভিযান শুরু হতে পারে। এই অভিযানে কয়েকটি বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে। সেগুলো হলো— খাদ্য গুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম, বস্তা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়, কর্মকর্তা বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া। এছাড়া পরিবহন ব্যয় ও ঠিকাদারি কার্যক্রমও তদন্তের আওতায় থাকতে পারে।

সম্প্রতি খাদ্য সচিব ফিরোজ সরকার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি বৈঠক করেছেন। বৈঠকে সচিব বদলি ও পদায়ন, খাদ্য সরবরাহ, ওএমএসসহ বিভিন্ন বিষয়ে কঠোরভাবে তদারকির গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি কর্মকর্তাদের বলেছেন, ‘খাদ্য বিভাগ দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

এখানে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তার বিষয়ে তদন্ত হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার খাদ্য গুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান-চাল সংগ্রহ এবং ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চায়। কোনো অযাচিত কাজ বিবেচনায় নেওয়া হবে না।

কেবল অভিযান চালিয়ে খাদ্য ব্যবস্থাপনা খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করা সম্ভব নয়। প্রশাসনে সংস্কার আনতে হলে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে দুর্নীতি আবার ফিরে আসবে। এজন্য একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করা প্রয়োজন এবং দোষ প্রমাণিত হলে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

খাদ্য বিভাগে আসন্ন এই শুদ্ধি অভিযানের খবর ইতোমধ্যে প্রশাসনের অন্দরমহলে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করছেন, সরকার যদি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে এবং কঠোর অবস্থানে থাকে, তবে এই খাতে দীর্ঘদিনের জেঁকে বসা দুর্নীতির সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।


এ বিষয়ে খাদ্য সচিব মো. ফিরোজ সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, খাদ্য বিভাগের দূর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পুরোপুরি ‘হার্ড লাইনে’ যাচ্ছি। খাদ্য খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি মোটেও মেনে নেওয়া হবে না।

এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আমাদের মন্ত্রী মহোদয়ের স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। তদন্তে যার বিরুদ্ধেই অভিযোগ প্রমাণিত হবে, আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

কালের সমাজ/কে.পি
 

Link copied!