কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নে ব্যবসায়ী মো. হানিফ মিয়া (৩৪) হত্যাকাণ্ডে এলাকায় নেমে এসেছে শোক, আতঙ্ক ও ক্ষোভের ছায়া। পরিবারের কান্না আর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে আনন্দ বাজার এলাকার পরিবেশ। একজন পরিশ্রমী কাঠ ব্যবসায়ী ও সমিল শ্রমিকের এমন নির্মম মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্থানীয়রাও।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, বুধবার (১৩ মে) রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রতিবেশী লস্কর মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন হানিফকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। পরিবারের সদস্যরা তখনও বুঝতে পারেননি, সেটিই হবে হানিফের জীবনের শেষ যাত্রা।
রাত গভীর হলে হঠাৎ স্ত্রী আয়েশার মোবাইল ফোনে আসে স্বামীর একটি আতঙ্কভরা কল। কাঁপা কণ্ঠে হানিফ শুধু বলছিলেন—“আমাকে বাঁচাও… জাকির হোসেনরা আমাকে মেরে ফেলবে…”
স্বামীর সেই অসহায় আর্তনাদ শুনে স্ত্রীর বুকফাটা কান্নায় ঘর ভারী হয়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান। কিন্তু অভিযুক্তদের বাড়ির গেট বন্ধ থাকায় ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি তারা। চারদিকে তখন শুধু উৎকণ্ঠা আর আতঙ্ক।
পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও এলাকাবাসীর সহায়তায় খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে লস্কর মিয়ার বাড়ির অদূরে ব্রহ্মপুত্র নদসংলগ্ন একটি পতিত ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় হানিফের নিথর মরদেহ। সেই দৃশ্য দেখে স্বজনরা বারবার মূর্ছা যান। ছোট ছোট সন্তানদের কান্না আর স্ত্রীর আহাজারিতে পুরো এলাকা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী আয়েশা বাদী হয়ে জাকির হোসেনকে প্রধান আসামি করে এজাহারভুক্ত ৯ জন ও অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে কুলিয়ারচর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। যাহার মামলা নং -৭ তারিখ -১৪-০৫-২০২৬।
মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে ৫ জনকে। তারা হলেন—লস্কর মিয়া (৪৫), হেলেনা বেগম (৪০), জীবন মিয়া (২৫), নাদিয়া আক্তার (২০) ও রুকিয়া বেগম (৫০)। গ্রেফতারকৃতদের কিশোরগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তবে মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত জাকির হোসেন এখনও পলাতক রয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানা গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, এলাকায় দীর্ঘদিনের বিরোধ ও মাদকসংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জের ধরেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে।
এদিকে ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বৃহস্পতিবার সকালে ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত লস্কর মিয়ার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে বাড়ির ভেতরে ও বাইরে থাকা একটি মোটরসাইকেলও পুড়ে যায়।
কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ কাজী আরীফ উদ্দিন বলেন, “হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। বর্তমানে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।”
কালের সমাজ/কে.পি

