বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতির অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী, পাপেট আন্দোলনের পথিকৃৎ, একুশে পদক প্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার।
সোমবার (২৯ জুন) রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
গত ১৪ জুন থেকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর আগে গত ২০ মে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা শেষে ৫ জুন বাসায় ফিরলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুই সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মঙ্গলবার বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হবে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তাঁর মরদেহ বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত শহীদ বেদিতে রাখা হবে। এরপর তাঁর জানাজা ও দাফনের অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।
প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সুযোগ্য সন্তান মুস্তাফা মনোয়ার দীর্ঘ কর্মজীবনে চিত্রকলা, শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণ, টেলিভিশন ও দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অসামান্য অবদান রেখেছেন। শিল্প ও সংস্কৃতিতে তার এই বিশাল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোরে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। শৈশব থেকেই শিল্পচর্চার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। পরবর্তীকালে চারুকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলেন। তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন একজন দক্ষ পাপেট নির্মাতা, উপস্থাপক, লেখক, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল বিকাশের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী।
বাংলাদেশে পাপেট শিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান অনন্য। তাঁকে দেশের পাপেটের জনক বলা হয়। শিশুদের আনন্দ, শিক্ষা ও নৈতিক বিকাশে পাপেটকে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি নিরলস কাজ করেছেন। তাঁর পরিকল্পনা ও নির্মাণে তৈরি অসংখ্য পাপেট অনুষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ও পরিবেশনা নতুন প্রজন্মের কাছে শিল্প ও শিক্ষার এক অভিনব দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
কর্মজীবনে মুস্তাফা মনোয়ার বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি শিল্পচর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং নতুন শিল্পী গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছে।
চিত্রকলায়ও মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর শিল্পকর্মে বাংলার প্রকৃতি, মানুষের জীবন, লোকজ ঐতিহ্য এবং মুক্তচিন্তার প্রকাশ ঘটেছে। দেশ-বিদেশে তাঁর বহু চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে এবং প্রশংসা কুড়িয়েছে। শিল্পকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার যে দর্শন তিনি ধারণ করতেন, তা তাঁর সমগ্র কর্মজীবনজুড়ে প্রতিফলিত হয়েছে।
দেশের শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়াও জীবদ্দশায় তিনি নানা সম্মাননা ও স্বীকৃতি লাভ করেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল শিল্পকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীল চর্চায় উদ্বুদ্ধ করা।
মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর প্রস্থান শুধু একজন চিত্রশিল্পীর বিদায় নয়, এটি বাংলাদেশের শিল্প, পাপেট আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান। তবে তাঁর সৃষ্টি, কর্ম এবং শিল্পভাবনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘদিন অনুপ্রাণিত করবে। দেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
কালের সমাজ/এএইচবি

