বাংলাদেশের প্রায় প্রতি বছরই নিয়ম করে জুলাই-আগস্ট মাসে বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। মূলত জুলাইয়ের শেষ এবং আগস্টের শুরুতেই উজানের ভারী বৃষ্টিতে ভাসে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চল। সঙ্গে স্থানীয়ভাবে ভারী বৃষ্টিপাত হলেতো কথাই নেই। তখন বানের পানিতে হাবুডুবু খেতে হয় মানুষকে। সেই সঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে ফসল, ভেঙ্গে নেয় বসত ভিটা। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে প্রতি বছরে বানের পানিতে কেন ডুবছে বাংলাদেশের একটা বিশাল অংশ।
বাংলাদেশে বন্যার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে উজানের পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি, ভৌগোলিক অবস্থান, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কারণ। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা বন্যা প্লাবনভূমির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বর্ষাকালে বন্যার ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে। এছাড়া গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশের ওপর বিপুল পরিমাণ উজানের পানির চাপ সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের নদ-নদীর ৯০ শতাংশেরও বেশি পানির উৎস ভারতের আসাম, মেঘালয় এবং হিমালয়ের পাদদেশীয় অঞ্চল। বর্ষাকালে এসব এলাকায় অতিবৃষ্টি এবং বরফ গলার ফলে বিপুল পরিমাণ পানি নেমে আসে। নদীগুলোর ধারণক্ষমতা সীমিত হওয়ায় অতিরিক্ত পানি সহজে প্রবাহিত হতে পারে না এবং বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।
বাংলাদেশ একটি নিচু বদ্বীপ অঞ্চল হওয়ায় অধিকাংশ স্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব বেশি উঁচু নয়। ফলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত জমে যায়। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় জোয়ারের প্রভাবে নদীর পানি সাগরে নামতে বাধাগ্রস্ত হয়, যার ফলে উপকূলীয় এলাকায় জলাবদ্ধতা ও বন্যার সৃষ্টি হয়।
মানবসৃষ্ট কারণও বন্যার জন্য দায়ী। নদীর তলদেশে পলি ও বালু জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া উজানের দেশগুলোতে নির্মিত বাঁধ ও জলাধারের স্লুইস গেট অতিবৃষ্টির সময় খুলে দিলে আকস্মিকভাবে বিপুল পরিমাণ পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করে, যা হঠাৎ বন্যার কারণ হতে পারে। তাই নদী খনন, সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে বন্যার ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
সোমবার (২০ জুলাই) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, পাহাড়ি ঢল ও ভারি বৃষ্টির কারণে দেশের উত্তর ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের ১১ জেলায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বল্পস্থায়ী বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলি স্টেশনে বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে।
অপরদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগামী দুদিন দেশের অভ্যন্তরে রংপুর ও সিলেট বিভাগে এবং উজানে ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলীয় রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল রয়েছে, যা আগামী তিনদিন বাড়তে পারে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় এসব নদীর পানি কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপর প্রবাহিত হতে পারে এবং লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও আকস্মিক অথবা স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে, অপরদিকে কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে; যা আগামী ৩ দিন বাড়তে পারে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় নদীর কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে অথবা বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সমতল স্থিতিশীল আছে। অপরদিকে যমুনা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী ৫ দিন বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। আজ থেকে পঞ্চম দিনে (২০ হতে ২৪ জুলাই) ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদী কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার কিছু স্থানে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও প্লাবিত হতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের সারিগোয়াইন, যাদুকাটা ও কংস নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে। অপরদিকে সোমেশ্বরী ও ভুলাই নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব নদীর পানি সমতল আগামী ৩ দিন বৃদ্ধি পেতে পারে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় নেত্রকোণা জেলার সোমেশ্বরী নদী কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলীয় রংপুর এবং রাজশাহী বিভাগের আপার করতোয়া, আপার আত্রাই, টাঙ্গন, পুনর্ভবা, মহানন্দা ও যমুনেশ্বরী নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে ঘাঘট, আত্রাই, করতোয়া ও ছোট যমুনা নদীর পানি সমতল হ্রাস পেয়েছে। আগামী ৩ দিন এসব নদীর পানি সমতল বাড়তে পারে।
কালের সমাজ/এএইচবি

