ঢাকা শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নতুন গভর্নরের ১১ পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক | ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নতুন গভর্নরের ১১ পরিকল্পনা
গভর্নর মোস্তাকুর রহমান

নতুন গভর্নরের বক্তব্যে স্পষ্ট—অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে অর্জিত সামষ্টিক স্থিতিশীলতাকে ভিত্তি করে এখন লক্ষ্য হবে— বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অর্থনীতিকে ‘লো লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম’ থেকে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার রূপরেখা তুলে ধরেছেন তিনি।

১. স্থিতিশীলতার ভিতের ওপর প্রবৃদ্ধি

গভর্নরের প্রথম অগ্রাধিকার—ম্যাক্রো অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অটুট রাখা। বৈদেশিক লেনদেন, রিজার্ভ, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব সমন্বয়ে যে ভারসাম্য তৈরি হয়েছে, সেটি যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। তার মতে, স্থিতিশীলতা ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।

২. অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান

শুধু জিডিপি বাড়ানোই লক্ষ্য নয়—প্রবৃদ্ধি হতে হবে ‘ইনক্লুসিভ’। অর্থাৎ শিল্প, এসএমই, কৃষি ও সেবা খাতে সমান সুযোগ তৈরি করে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিই হবে নীতির মূল সূচক—এমন বার্তাই দিয়েছেন গভর্নর।

৩. বন্ধ কলকারখানা চালুতে নীতিগত সহায়তা

গত দেড় বছরে নানা কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় সচল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা দেবে। ঋণ পুনঃতফসিল, সুদে ছাড়, বিশেষ তহবিল—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হবে। উৎপাদন ও রফতানি বাড়িয়ে কর্মসংস্থান তৈরিই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

৪. উচ্চ সুদের হার পুনর্বিবেচনা

বিনিয়োগে অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে উচ্চ সুদের হারকে চিহ্নিত করেছেন গভর্নর। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন—সুদের হার কমানো হবে পরিস্থিতি বিবেচনায়, যাতে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ না পড়ে। অর্থাৎ ঋণপ্রবাহ ও মূল্যস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য আনার কৌশল নেওয়া হবে।

৫. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার

‘প্রাইস স্ট্যাবিলিটি’ বা মূল্যস্থিতি বজায় রাখা হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে মুদ্রানীতি কঠোর বা নমনীয়—যা প্রয়োজন, তা-ই প্রয়োগ করা হবে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির প্রবণতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।

৬. সুশাসন নিশ্চিতকরণ

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন (গুড গভর্ন্যান্স) নিশ্চিত করার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন গভর্নর। অনিয়ম, পক্ষপাত বা অস্বচ্ছতা রোধে কঠোর নজরদারি থাকবে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হবে।

৭. অবজেকটিভভিত্তিক সিদ্ধান্ত

কোনও সিদ্ধান্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা প্রভাবনির্ভর হবে না—এমন বার্তা দিয়ে গভর্নর বলেন, সব সিদ্ধান্ত হবে তথ্য-উপাত্ত ও নীতিমালাভিত্তিক। এতে নীতি-অনিশ্চয়তা কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।

৮. রুল-বেইজড ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা

ব্যাংক পরিচালনায় নিয়মভিত্তিক কাঠামো কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে। ঋণ বিতরণ, পুনঃতফসিল, লাইসেন্সিং বা তদারকিতে সমান নীতি প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।

৯. ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ

কাজের গতি বাড়াতে ‘ডেলিগেশন অব অথরিটি’ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এতে ফাইলজট কমবে এবং সেবা দ্রুত হবে।

১০. আন্ত-সংস্থাগত সমন্বয়

সরকারের অন্যান্য সংস্থা—বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয়, রাজস্ব বোর্ড ও পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হবে। সমন্বিত নীতি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না—এমন অভিমত দেন গভর্নর।

১১. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাবমূর্তি রক্ষা

সবশেষে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ও আস্থা পুনর্গঠনের কথা বলেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিশ্লেষণ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

নতুন গভর্নরের ১১ দফা পরিকল্পনা মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে—

১. স্থিতিশীলতা, ২. বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, ৩. সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

বর্তমানে অর্থনীতির সামনে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং শিল্প উৎপাদনে মন্থর গতি। এ প্রেক্ষাপটে বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবন ও সুদের হার পুনর্বিবেচনা তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। তবে সুদের হার কমালে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এ ভারসাম্য রক্ষা হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

অপরদিকে, নিয়মভিত্তিক ব্যাংকিং ও সুশাসনের অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলে খেলাপি ঋণ ও আস্থাহীনতার সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে।

এছাড়া ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নতুন গভর্নর।

পাশাপাশি দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে নীতিগত সুবিধা ও প্রণোদনা দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহযোগিতা নিশ্চিত করেছেন। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান।

গভর্নর বৈঠকে বলেন,‘‘ উৎপাদন বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ব্যাংকিং খাতে সমন্বয় জোরদার করা হবে। এছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ সুদের হার পর্যালোচনা ও ঋণপ্রবাহের ভারসাম্য রক্ষা করা হবে।’’

তিনি প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়মভিত্তিক ও বৈষম্যহীন করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং কর্মকর্তাদের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে কাজের গতি বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেন।’’ গভর্নর বলেন, ‘‘পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্জিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করা হবে।’’

প্রথম দিনেই নীতিগত অগ্রাধিকারের স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গভর্নর ইঙ্গিত দিয়েছেন—কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু নিয়ন্ত্রক নয়, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে সক্রিয় নীতিনির্ধারক ভূমিকা পালন করতে চায়। এখন দেখার বিষয়—ঘোষিত ১১ পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপে রূপ পায় এবং তা কতটা কার্যকরভাবে অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে নিতে।

Side banner
Link copied!