ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

খুনের ঘটনায় বাংলাদেশ পুলিশের নথি থেকে নাম কাটাতে ৯০ হাজার ডলার ঘুষ

কালের সমাজ ডেস্ক | সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম খুনের ঘটনায় বাংলাদেশ পুলিশের নথি থেকে নাম কাটাতে ৯০ হাজার ডলার ঘুষ

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক অস্ট্রেলীয় নারীর রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্ত প্রভাবিত করতে এবং বাংলাদেশ পুলিশের নথি থেকে নিজের নাম কাটাতে ৯০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে ৫১ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ (এএফপি)।

এএফপির ওয়েবসাইটে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া এবং ফৌজদারি তদন্তের গতিপথ পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ার আদালতে মামলা হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি কুইন্সল্যান্ডের রেডব্যাংক প্লেইনসের বাসিন্দা এবং নিহত নারীর পূর্ব পরিচিত। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) তাকে ব্রিসবেন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার ষড়যন্ত্র এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিপুল অর্থ পাঠানোর প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে এএফপি।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। ওই সময় কুইন্সল্যান্ড পুলিশ সার্ভিস (কিউপিএস) এএফপিকে জানায়, অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা এক নারী বাংলাদেশে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। পরে বাংলাদেশ পুলিশ অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষকে জানায়, বাংলাদেশে ওই নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের ফরেনসিক পরীক্ষায় পরে নিশ্চিত করা হয়, ওই নারীর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না এবং ঘটনাটি সন্দেহজনক মৃত্যু হিসেবে বিবেচিত হয়।

অস্ট্রেলিয়ার ক্রিমিনাল কোডের ১১৫ ধারার আওতায় বিদেশে অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের হত্যা, অপমৃত্যু বা গুরুতর ক্ষতির ঘটনায় আন্তর্জাতিক এখতিয়ার রয়েছে এএফপির। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি এএফপিও আলাদাভাবে তদন্ত শুরু করে।

এএফপির তদন্তে অভিযোগ ওঠে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই ব্যক্তি বাংলাদেশে প্রায় ৯০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার পাঠিয়েছেন। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে মৃত্যুর তদন্ত নিজের অনুকূলে প্রভাবিত করা এবং বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তসংক্রান্ত নথি ও রেকর্ড থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়া।

তদন্তের অংশ হিসেবে সিডনি ও ব্রিসবেনের একাধিক আর্থিক ও ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালায় এএফপি। এ সময় আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের রেকর্ড, ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়।

দুই বছরের তদন্তের পর সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) কুইন্সল্যান্ডের গুডনা ও রেডব্যাংক প্লেইনস এলাকার দুটি আবাসিক ভবনে অভিযান চালিয়ে ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে একাধিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার ফৌজদারি আইনের ৭০.২ (১) ধারায় বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার একটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

এএফপি জানিয়েছে, বিদেশি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অভিযোগে এটি সংস্থাটির ইতিহাসে প্রথম মামলা। এএফপির কমান্ডার স্টিফেন জয় বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় কিংবা বিদেশে—যেকোনো জায়গায় বিচারিক বা তদন্ত প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিগ্রস্ত করার চেষ্টা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।

তিনি বলেন, ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগকে এএফপি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয়, বিশেষ করে যখন কোনো গুরুতর অপরাধের তদন্তের ফল পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। অর্থের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ বা প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের আইনগত জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

স্টিফেন জয় আরও জানান, আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে এএফপি।

তবে অস্ট্রেলীয় পুলিশ জানিয়েছে, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বাংলাদেশি নারীর রহস্যজনক মৃত্যুর মূল তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।

কালের সমাজ/এসআর

Link copied!