ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২
তিন গম্বুজে বন্দি সময়

ফাতেহ খাঁ জামে মসজিদের নীরব গল্প

মোহাম্মদ আলী সুমন | ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬, ০৩:৪৭ পিএম ফাতেহ খাঁ জামে মসজিদের নীরব গল্প

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ভগড় গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক শান্ত স্থিরতা। সবুজ গাছপালার ফাঁকে, সময়ের ধুলো মেখে দাঁড়িয়ে আছে তিন গম্বুজের একটি মসজিদ-ফাতেহ খাঁ জামে মসজিদ। প্রথম দেখাতেই বোঝা যায়, এটি কেবল ইট-সুরকির স্থাপনা নয়, এটি সময়ের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এক জীবন্ত ইতিহাস।

মাঝখানের বড় গম্বুজটি যেন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে অবিচল দৃষ্টিতে, আর দুই পাশে ছোট দুটি গম্বুজ নীরবে তার সঙ্গ দিচ্ছে। দিনের আলোয় মসজিদের দেয়ালে পড়ে ছায়ার খেলা, সন্ধ্যায় আজানের ধ্বনিতে চারপাশ হয়ে ওঠে আরও ভারী, আরও গভীর।

ইতিহাসের ছায়া, মানুষের বিশ্বাস
জনশ্রুতি বলে, প্রায় আড়াইশ থেকে তিনশ বছর আগে এই মসজিদ নির্মাণ করেন এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি-ফাতেহ খাঁ। তাঁর নামেই মসজিদের নাম। ইতিহাসের পাতায় তাঁর জীবন নিয়ে বিস্তারিত বিবরণ না থাকলেও, এই মসজিদই তাঁর পরিচয়, তাঁর রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় স্বাক্ষর।

যুগ যুগ ধরে এখানকার মানুষ এই মসজিদেই মাথা নত করেছে স্রষ্টার কাছে। কত প্রজন্মের নামাজ, কত দোয়া, কত অশ্রু আর কৃতজ্ঞতা জমে আছে এই দেয়ালের গায়ে-তা কেউ গুনে বলতে পারবে না।

স্থাপত্যে মুসলিম শিল্পকলার ছাপ
ফাতেহ খাঁ জামে মসজিদের স্থাপত্যে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে মোগল আমলের প্রভাব। তিন গম্বুজের বিন্যাস, চার কোণের স্তম্ভ, দেয়ালের অলংকরণ-সবকিছুতেই রয়েছে নিখুঁত কারিগরি দক্ষতার ছাপ।

মসজিদের ভেতরে ঢুকলে মনে হয়, সময় যেন একটু ধীর হয়ে আসে। প্রশস্ত নামাজ কক্ষ, সুশোভিত দেয়াল আর নীরবতার মধ্যে ভেসে থাকা ইতিহাস-সব মিলিয়ে এটি শুধু উপাসনার স্থান নয়, এক গভীর অনুভবের জায়গা।

সংরক্ষণের অপেক্ষায় এক ঐতিহ্য
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোহা. নাহিদ সুলতানা বলেন, এটি মোগল আমলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ। এর বয়স ৩০০ বছরেরও বেশি হতে পারে। মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, সময়ের অবহেলায় একদিন হয়তো এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। তাই তারা চান, ফাতেহ খাঁ জামে মসজিদকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করে যথাযথ সংরক্ষণ করা হোক।

সময়ের কাছে এক নীরব প্রশ্ন
ফাতেহ খাঁ জামে মসজিদ আজও দাঁড়িয়ে আছে-নীরবে, দৃঢ়ভাবে। তিনটি গম্বুজ যেন তিনটি যুগের প্রতিনিধি হয়ে ইতিহাসের গল্প বলে চলে। প্রশ্ন একটাই-আমরা কি এই গল্পগুলো শুনতে প্রস্তুত? নাকি অবহেলায় হারিয়ে যেতে দেব আরেকটি মূল্যবান অধ্যায়?

এই মসজিদ শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, এটি আমাদের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়।

কালের সমাজ/এসআর

Side banner
Link copied!