ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় শিল্পায়নের নতুন জোয়ারে বদলে যাচ্ছে পুরো জনপদের চিত্র। প্রায় ১৬০ বিঘা জমি (প্রায় ২১ হেক্টর) জুড়ে গড়ে ওঠা তুষার সিরামিকস লিমিটেডসহ একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
তুষার সিরামিকস, বি অ্যান্ড টি কেবল, স্মার্ট মিটার উৎপাদন কারখানা, অ্যালুমিনিয়াম প্লান্ট, আধুনিক কোল্ড স্টোর এবং একটি পরিকল্পিত আবাসিক প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি সমন্বিত শিল্পাঞ্চল, যা শুধু মহেশপুর নয়, আশপাশের জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। এক সময় কৃষিনির্ভর ও সীমিত আয়ের এই অঞ্চলে এখন সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত। শিল্পাঞ্চলে প্রত্যক্ষভাবে কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করছেন এবং পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছেন হাজারো পরিবার।
স্থানীয় বাজারে বেড়েছে অর্থের প্রবাহ, ছোট ব্যবসা-বাণিজ্যে এসেছে গতি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে এবং আবাসন খাতেও দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা। কারখানাগুলোর শ্রমিকরা বলছেন, এই শিল্পাঞ্চল তাদের জীবনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এনে দিয়েছে। বি অ্যান্ড টি কেবলের কর্মী হাসান আলী বলেন,আগে কাজের নিশ্চয়তা ছিল না। কখনো কাজ থাকত, কখনো থাকত না। এখন নিয়মিত আয় হচ্ছে, পরিবারের খরচ চালাতে আর অনিশ্চয়তায় থাকতে হয় না। একই প্রতিষ্ঠানের আরেক কর্মী বিকাশ কুমার বলেন,এখানে কাজ করে ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারছি। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ ঠিকমতো চালাতে পারছি। আমাদের মতো অনেক পরিবারের জীবন বদলে গেছে। স্মার্ট মিটার কারখানার কর্মী রাসেল আহমেদ বলেন,কাজের পরিবেশ ভালো এবং দীর্ঘমেয়াদে কাজ করার সুযোগ আছে। এতে আমরা আত্মবিশ্বাস পাচ্ছি।
প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে নতুন দক্ষতাও অর্জন করছি।কোল্ড স্টোরের কর্মী শাহেদুল ইসলাম বলেন,এই কোল্ড স্টোরের কারণে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ করতে পারছেন। এতে যেমন কৃষক লাভবান হচ্ছেন, তেমনি আমাদেরও কর্মসংস্থান হয়েছে।তুষার সিরামিকসের কয়েকজন কর্মী জানান, এই শিল্পাঞ্চল এখন পুরো এলাকার উন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তারা বলেন, শুধু চাকরি নয়, এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের আত্মমর্যাদা ও নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দিয়েছে। শিল্পাঞ্চল ঘিরে গড়ে ওঠা পরিকল্পিত আবাসিক প্রকল্প নিয়েও আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।
আবাসিক পরিচালক . ওয়াহেদুজ্জামান বলেন,আমরা শুধু একটি শিল্প এলাকা গড়ে তুলছি না, বরং একটি আধুনিক, নিরাপদ ও টেকসই কমিউনিটি নির্মাণ করছি।কর্মীদের জন্য উন্নত আবাসন, নাগরিক সুবিধা এবং মানসম্মত জীবনযাত্রা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।সহকারী পরিচালক মোঃ মুন্তাছির রহমান বলেন,এই শিল্পাঞ্চল স্থানীয় তরুণদের জন্য আশার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। আমরা দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি, যাতে দীর্ঘমেয়াদে এ অগ্রযাত্রা টেকসই হয়।
কারখানার মালিক ইঞ্জিনিয়ার মোকলেসুর রহমান বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং মহেশপুরে একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি গড়ে তোলা। আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে দেশীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানির বাজারেও প্রবেশের পরিকল্পনা রয়েছে।তিনি আরও বলেন, “স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং প্রশাসনের ইতিবাচক ভূমিকার কারণে আমরা দ্রুত এগোতে পারছি। এই শিল্পাঞ্চল ভবিষ্যতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। পরিবেশগত বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সাজ্জাদ হোসেন বলেন,মহেশপুরে গড়ে ওঠা এই শিল্পাঞ্চল স্থানীয় উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
এটি শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে না, বরং পুরো উপজেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ বলছেন, শিল্প, কৃষি ও আবাসনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ মহেশপুরের অর্থনীতিকে নতুন ভিত্তি দিয়েছে। বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, পরিবহন ও সেবাখাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সঠিক পরিকল্পনা, অব্যাহত বিনিয়োগ এবং প্রশাসনিক সহায়তা থাকলে এই শিল্পাঞ্চল একদিন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হবে। মহেশপুরের মানুষ এখন নতুন স্বপ্ন দেখছে একটি আধুনিক, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভর জনপদের স্বপ্ন।
কালের সমাজ/কে.পি

