ঢাকা শুক্রবার, ০৮ মে, ২০২৬, ২৫ বৈশাখ ১৪৩৩

বিলুপ্তির সীমানায় নির্মাণের নিপুণ কারিগর ‘বাবুই পাখি’

হাসনাত হান্নান তামিম, মহম্মদপুর (মাগুরা) | মে ৮, ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম বিলুপ্তির সীমানায় নির্মাণের নিপুণ কারিগর ‘বাবুই পাখি’

“বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই” রজনীকান্ত সেনের কবিতার সেই পঙক্তি আজও মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবে সেই ‘শিল্পের বড়াই’ করা পাখিটিই এখন চোখে পড়ে খুব কম।

মাগুরার মহম্মদপুরে এক সময় তালগাছে ঝুলে থাকা বাবুই পাখির বাসা ছিল খুবই পরিচিত দৃশ্য। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। গ্রাম-বাংলার এ চেনা পাখিটি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে।

বাবুই পাখির বাসা শুধু আশ্রয় নয়, এটি প্রকৃতির এক নিখুঁত নির্মাণশৈলী। তালের পাতা, নারিকেলের আঁশ, ঘাস ও খড় দিয়ে তারা সুড়ঙ্গ আকৃতির যে বাসা তৈরি করে, তা ঝড়-বৃষ্টিতেও সহজে নষ্ট হয় না। এই কারণেই বাবুই পাখিকে প্রকৃতির স্থপতি বলা হয়। তবে এই স্থপতিরাই এখন আশ্রয় সংকটে পড়েছে। নগরায়ণ ও নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে তালগাছ ও নারিকেল গাছ কমে যাচ্ছে, ফলে তাদের স্বাভাবিক বাসস্থানও সংকুচিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের প্রভাবও পড়ছে এই পাখির ওপর। পরিবেশবিদদের মতে, বাবুই পাখির প্রধান খাদ্য ক্ষতিকর পোকামাকড়। কিন্তু কীটনাশকের কারণে সেই পোকামাকড়ের মাধ্যমেই বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে পাখিগুলো, যার ফলে তাদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বাবুই পাখির প্রজনন প্রক্রিয়াও বেশ ব্যতিক্রমী। পুরুষ পাখি বাসা তৈরি করে স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করে, আর বাসার গঠন পছন্দ হলেই তারা সেখানে বসবাস শুরু করে।

স্থানীয় প্রবীণরা বলছেন, আগে সকালে পাখির ডাকেই ঘুম ভাঙত, এখন সেই জায়গা নিয়েছে যান্ত্রিক শব্দ। শুধু বাবুই নয়, দোয়েল, শালিক, কোকিল, চিলসহ আরও অনেক দেশি পাখিও কমে যাচ্ছে দিন দিন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তালগাছ শুধু বাবুই পাখির আশ্রয় নয়, এটি বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা দিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে তালগাছ কমে যাওয়ার প্রভাব মানুষের ওপরও পড়ছে।

তাদের মতে, পরিকল্পিতভাবে তালগাছ ও অন্যান্য গাছ রোপণ, কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। প্রকৃতির এই ছোট্ট নির্মাতা হারিয়ে গেলে তা শুধু একটি পাখির বিলুপ্তি নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করবে।

কালের সমাজ/এসআর

গ্রাম-গঞ্জ বিভাগের আরো খবর

Link copied!