ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩

সড়ক দুর্ঘটনায় বাবাকে হারিয়ে মানবিক সহায়তার অপেক্ষায় পরিবার

মোহাম্মদ আলী সুমন | জুলাই ১৭, ২০২৬, ০৮:০০ পিএম সড়ক দুর্ঘটনায় বাবাকে হারিয়ে মানবিক সহায়তার অপেক্ষায় পরিবার

একটি সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে। কিন্তু সেই মৃত্যুও নিভিয়ে দিতে পারেনি এক কিশোরীর স্বপ্ন। বাবার অসমাপ্ত স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে এখনও বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করার প্রত্যয় নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া ইউনিয়নের মুরাদপুর পোনসাইর গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থী শ্রাবন্তী আক্তার। তবে চরম আর্থিক সংকটে তার সেই স্বপ্ন আজ টিকে আছে শুধুই সমাজের সহানুভূতি ও রাষ্ট্রের সহযোগিতার আশায়।

শ্রাবন্তীর বাবা ছালাম মিয়া (৬০) স্থানীয় মুরাদপুর বাজারের একজন বাজার পাহারাদার (নাইট গার্ড) ছিলেন। অতি সামান্য আয়ে পাঁচ মেয়েকে মানুষ করেছেন তিনি। বড় তিন মেয়েকে বিয়ে দিলেও ছোট দুই মেয়ের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছিলেন। বিশেষ করে ছোট মেয়ে শ্রাবন্তীকে উচ্চশিক্ষিত করে সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গত ২৫ জুন বিকেলে গৌরীপুর থেকে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেনে কুটুম্বপুর বাসস্ট্যান্ডে বাস থেকে নামার পর একটি দ্রুতগামী লরি তাকে চাপা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে তিনটার দিকে তিনি মারা যান। সেই দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে পড়ে পরিবারের ভবিষ্যতের সব স্বপ্ন।

বর্তমানে শ্রাবন্তী কুটুম্বপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে যে তার ছোট বোন সেঁজুতির পড়াশোনা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক সময় দুবেলা খাবার জোটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও আত্মীয়-স্বজন ও সমাজের কিছু সহৃদয় মানুষের সহযোগিতায় নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে শ্রাবন্তী।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শ্রাবন্তী বলে, “আমার স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হওয়া। বাবা সব সময় আমাকে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে বলতেন। তিনি চাইতেন আমি একদিন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করি। বাবা আর নেই, কিন্তু আমি তার সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। অনেক কষ্টের মধ্যেও আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই।”

শ্রাবন্তীর মা রুবি আক্তার বলেন, “আমাদের কোনো ছেলে সন্তান নেই, পাঁচটি মেয়েই আমাদের সব। আমার স্বামীই ছিলেন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি বাজার পাহারা দিয়ে যে সামান্য বেতন পেতেন, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চলত। স্বামী মারা যাওয়ার পর মানুষের সহযোগিতায় খুব কষ্টে দিন পার করছি। সরকার যদি আমাদের কিছু আর্থিক সহায়তা দেয় এবং মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব নেয়, তাহলে হয়তো ওর বাবার স্বপ্ন পূরণ হবে।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, ছালাম মিয়া ছিলেন অত্যন্ত সৎ, দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী একজন মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে মুরাদপুর বাজারের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তার আকস্মিক মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকাই একজন বিশ্বস্ত মানুষকে হারিয়েছে।

মুরাদপুর বাজারের ব্যবসায়ী মো. আব্দুল বাতেন মেম্বার বলেন, “শ্রাবন্তী একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। আর্থিক সংকটের কারণে যদি তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এটি শুধু একটি পরিবারের নয়, সমাজেরও অপূরণীয় ক্ষতি হবে। আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের বিত্তবান মানুষের প্রতি পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।”

পোনসাইর গ্রামের বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম মিয়া বলেন, “ছালাম মিয়ার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল মেয়েদের শিক্ষিত করা। তিনি চাইতেন অন্তত একজন মেয়ে বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশের সেবা করুক। তার মৃত্যুর পর সেই স্বপ্ন যেন থেমে না যায়, সেজন্য সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত।”

এলাকাবাসীর দাবি, মেধাবী শিক্ষার্থী শ্রাবন্তীর পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে সরকারি বৃত্তি, শিক্ষা সহায়তা বা বিশেষ আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবারটিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এনে স্থায়ী সহায়তা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

একজন বাবার অসমাপ্ত স্বপ্ন আজ মেয়ের চোখে বেঁচে আছে। প্রতিদিন অভাবের সঙ্গে লড়াই করেও বই খুলে বসে শ্রাবন্তী। তার বিশ্বাস, সুযোগ পেলে একদিন সে বিসিএস ক্যাডার হয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণ করবে। এখন শুধু প্রয়োজন সমাজের সহমর্মিতা এবং রাষ্ট্রের কার্যকর সহযোগিতা, যাতে একটি মেধাবী স্বপ্ন অভাবের কাছে হার না মানে।

কালের সমাজ/কে.পি

গ্রাম-গঞ্জ বিভাগের আরো খবর

Link copied!