ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বিআরআইয়ের পর জিডিআই

ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

কালের সমাজ ডেস্ক | জুন ২৪, ২০২৬, ০৬:৫৩ পিএম ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা
ছবি সংগ্রহ

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)- অংশগ্রহণের প্রায় এক দশক পর বেইজিংয়ের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ। চীনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চলমান সফরে বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।

আগামী ২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বৈঠক শেষে প্রায় ১৭টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক, অ্যাকশন প্ল্যান নথি বিনিময় হতে পারে। এর মধ্যে জিডিআইয়ে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিডিআইয়ে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে এবং দুই দেশের উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করবে।

চীন ২০২১ সালে জিডিআই ঘোষণা করার পর থেকেই বাংলাদেশকে উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। গত কয়েক বছরে দুই দেশের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পর বাংলাদেশ উদ্যোগে যোগদানের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর উন্নয়ন অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন উৎস খুঁজছে। জিডিআইয়ের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর, জলবায়ু অভিযোজন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো খাতে নতুন সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই) ঘোষণা করেন। এর মূল লক্ষ্য হলো জাতিসংঘের ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

জিডিআইয়ের আওতায় আটটি অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো, দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, মহামারি মোকাবিলা ভ্যাকসিন সহযোগিতা, উন্নয়ন অর্থায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন সবুজ উন্নয়ন, শিল্পায়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি সংযোগ, এবং অবকাঠামো উন্নয়ন। চীনের দাবি, জিডিআই কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা জোট নয়; বরং এটি উন্নয়ন সহযোগিতাভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম।

বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি কারণে বাংলাদেশ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আগ্রহী। প্রথমত, এলডিসি উত্তরণের পর উন্নয়ন অর্থায়ন প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন বাড়বে। জিডিআইয়ের মাধ্যমে অবকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ জ্বালানি মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন সহযোগিতা পাওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চীনের বিআরআই উদ্যোগের অংশ। ফলে জিডিআইয়ে যুক্ত হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে।

তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মতো খাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। জিডিআই এসব ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় ঢাকা এতে সম্ভাবনা দেখছে।

বাংলাদেশ এখনো চীনের নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ, যেমন গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই)- যোগদানের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, উন্নয়ন সহযোগিতা নিরাপত্তা রাজনীতিকে আলাদা রাখতেই ঢাকা আগ্রহী।

চীনের তথ্য অনুযায়ী, ১০০টিরও বেশি দেশ আন্তর্জাতিক সংস্থা জিডিআইকে সমর্থন জানিয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘে গঠিতগ্রুপ অব ফ্রেন্ডস অব জিডিআই’- ৮০টিরও বেশি দেশ অংশ নিয়েছে। বেইজিংয়ের দাবি, জিডিআই ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ ঘোষণা করেছেন। এগুলো হলো, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই), গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই),  গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (জিসিআই) ও গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ (জিজিআই)

বর্তমানে বাংলাদেশ জিডিআইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। অন্যান্য উদ্যোগে অংশগ্রহণের প্রশ্নে সরকার ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেবে।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদের মতে, চীন অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশকে জিডিআইয়ে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আসছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ যেহেতু ইতোমধ্যে বিআরআইয়ের অংশ, তাই জিডিআইয়ে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও বড় কোনো বাধা নেই।

অন্যদিকে, পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগে যোগদানের বিষয়টি বাংলাদেশ বিবেচনা করছে। সফর-পরবর্তী সময়ে কোন কোন উদ্যোগে বাংলাদেশ যুক্ত হবে সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জিডিআইয়ে যুক্ত হলে তা ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেবে এবং উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করবে। তবে একই সঙ্গে আঞ্চলিক বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও বাংলাদেশের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে থাকবে।

কালের সমাজ/এএইচবি

 

Link copied!