পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনায় কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এরই মধ্যে ‘ব্যর্থ সংলাপ’ শেষে ‘শান্তি চুক্তি’ ছাড়াই পাকিস্তান ছেড়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল।
শান্তির জন্য ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সংলাপ’ শেষে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারার জন্য পরস্পরকে দায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
ত্রিপক্ষীয় ম্যারাথন বৈঠকের পর পাকিস্তান ছাড়ার আগে ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের প্রধান দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নমনীয়তা ও সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছিল।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।
ভ্যান্স বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনা করেছি এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা হয়েছে—এটাই ভালো খবর। কিন্তু খারাপ খবর হলো, আমরা কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারিনি।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই বলেছেন, এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করছে বিপরীত পক্ষের আন্তরিকতা, সদিচ্ছার ও সৎ অবস্থানের ওপর।
তিনি ওয়াশিংটনকে ‘অতিরিক্ত ও অবৈধ দাবি’ পরিহার করে ইরানের ‘বৈধ অধিকার ও স্বার্থ’ মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।
ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় এমন কিছু বিষয় দাবি করেছে, যা তারা যুদ্ধের মাধ্যমেও অর্জন করতে পারেনি। হরমুজ প্রণালি, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচি ও আরও বেশ কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাভিলাষী শর্তগুলো তেহরান মেনে নেয়নি।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর প্রথমবারের মতো শনিবার সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মধ্যে এই সরাসরি আলোচনা রোববার পর্যন্ত গড়ায়। ঐতিহাসিক এ শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদলে নেতৃত্ব দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে ইরান প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ইরান পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ। ইরান প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আয়োজক হিসেবে দুই পক্ষের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন।
শান্তি আলোচনা পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও বলেন, আমরা এখানে একটি খুবই সহজ প্রস্তাব রেখে যাচ্ছি—এটাই আমাদের চূড়ান্ত এবং সর্বোত্তম প্রস্তাব। এখন দেখা যাক ইরান তা গ্রহণ করে কি না।
তিনি বলেন, আমরা স্পষ্ট করে জানিয়েছি আমাদের ‘রেড লাইন’ কী, কোন বিষয়ে আমরা ছাড় দিতে পারি এবং কোন বিষয়ে পারি না। কিন্তু ইরানি প্রতিনিধিদল আমাদের শর্তগুলো গ্রহণ করেনি।
ইরান কী প্রত্যাখ্যান করেছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভ্যান্স বলেন, সব বিস্তারিত প্রকাশ করতে চাই না, কারণ ২১ ঘণ্টা গোপনে আলোচনার পর প্রকাশ্যে আলোচনা করতে চাই না। তবে মূল বিষয় হলো—আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং এমন সক্ষমতাও অর্জনের চেষ্টা করবে না, যা তাদের দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ‘মূল লক্ষ্য’ এবং আলোচনার মাধ্যমে সেটিই অর্জনের চেষ্টা করা হয়েছে।
ভ্যান্স বলেন, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো ‘ধ্বংস করা হয়েছে’, তবে মূল প্রশ্ন হলো—ইরান দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে মৌলিক প্রতিশ্রুতি দেবে কি না। আমরা এখনো সেই প্রতিশ্রুতি দেখিনি, তবে আশা করি দেখব।
আলোচনায় ইরানের জব্দকৃত সম্পদের বিষয়টি উঠেছিল কি না—এ প্রশ্নে ভ্যান্স বলেন, এসব বিষয়সহ আরও অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আমরা এমন কোনো অবস্থায় পৌঁছাতে পারিনি, যেখানে ইরান আমাদের শর্ত মেনে নিতে রাজি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল ‘যথেষ্ট নমনীয়’ ও ‘সহনশীল’ ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
ভ্যান্স জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিনিধি দলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘সৎ উদ্দেশ্য’ নিয়ে আলোচনায় অংশ নিতে এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ করতে। আমরা সেটাই করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কোনো অগ্রগতি করতে পারিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইসমাইল বাগাই বলেন, পাকিস্তানের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও মধ্যস্থতায় শনিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া নিবিড় আলোচনা এখন পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলছে এবং দুই পক্ষের মধ্যে অসংখ্য বার্তা ও খসড়া বিনিময় হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরও লিখেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় আলোচনার মূল বিষয়গুলোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক ইস্যু, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের বিরুদ্ধে ও এই অঞ্চলে যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান।
এদিকে একটি দায়িত্বশীল সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ ইরানের অবস্থান সম্পর্কে জানিয়েছে, ইরান বলছে ‘বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে’ এবং আলোচনায় যাওয়ার ক্ষেত্রে ‘ইরানের কোনো তাড়াহুড়ো নেই’।
ইরানের ওই সূত্র বলেছে, ইরান আলোচনায় যুক্তিসঙ্গত উদ্যোগ ও প্রস্তাব দিয়েছে। এখন বিষয়গুলো বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনা করা যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব। যুদ্ধের মতোই আলোচনাতেও যুক্তরাষ্ট্র ভুল হিসাব করেছে।
সতর্ক করে ওই সূত্র বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র একটি যুক্তিসঙ্গত চুক্তিতে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ অনেক শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাকে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া কয়েক হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার আহত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ব্যাপক সামরিক হামলার জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ওই অঞ্চলে এবং দখলকৃত ভূখণ্ডে মার্কিন ও ইসরায়েলি অবস্থানগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়।
পরিস্থিতি শান্ত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে যায় দুই দেশ। তারই ধারাবাহিকতায় গত দুই দিন ইসলামাবাদের এ শান্তি আলোচনা হয়। সূত্র: ডন, বিবিসি ও আল-জাজিরা
কালের সমাজ/এসআর

