ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩

কারাগারে থাকাবস্থায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়েছেন কামরুল

কালের সমাজ ডেস্ক | এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম কারাগারে থাকাবস্থায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়েছেন কামরুল

দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ২০২৪ সাল থেকেই কারাগারে আছেন সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম। তবে তার আইনীজীরা ট্রাইব্যুনালে যে স্বাস্থ্যগত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন, তাতে দেখা যায় তিনি সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল থেকে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করেছেন। জেলখানায় থেকে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালের রিপোর্ট দাখিল করায় ওই রিপোর্টের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রসিকিউশন।

এ অবস্থায় কারাগারে বন্দী থেকেও কামরুল ইসলাম কিভাবে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিলেন সে বিষয়ে কামরুলের আইনজীবীর কাছে ব্যাখ্যা তলবে করেছেন ট্রাইব্যুনাল। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দাখিল করতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে কামরুল ইসলামকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তরের আবেদন বাতিল করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-১।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন।
কামরুল ইসলাম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ২০২৪ সালে। সেই থেকেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি কারাগারেই রয়েছেন। জানা গেছে, একজন আসামীর চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সাধারণত জেলখানার হাসপাতালেই চিকিৎসাতা পেয়ে থাকে৷ কামরুল ইসলামের অসুস্থতার ধরন দেখে কামরুলের আইনজীবীর আবেদনে ট্রাইব্যুনাল তাকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসার অনুমতি দেন। বর্তমানে কামরুল এই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন৷

কিন্তু তার আইনজীবী কামরুল ইসলামকে এই হাসপাতাল থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তরের আবেদন করেন৷ আবেদনপত্রে কামরুলের অসুস্থতা সংক্রান্ত যে প্রয়োজন রিপোর্ট জমা দেয়,সে রিপোর্টের সত্যতা নিয়ে ট্রাইব্যুনালে প্রশ্ন তুলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম৷ তিনি ট্রাইব়্যুনালকে জানান, কামরুল ইসলামের আইনজীবী কর্তৃক দাখিলকৃত ডকুমেন্টসগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল থেকে তিনি চিকিৎসা নিয়েছিলেন৷ কিন্তু সে সময়ে তো তিনি জেলখানায় থাকার কথা৷

তখন ট্রাইব্যুনাল মেম্বার শফিউল আলম মাহমুদ কামরুলের আইনজীবীকে বলেন, আপনার ক্লায়েন্ট এই সময় জেলখানায়৷ সেখানে থেকে তিনি কিভাবে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিলেন? কোর্টের অনুমতি ব্যতীত এই রিপোর্ট ডাক্তার কিভাবে দেবে? এরপর চিফ প্রসিকিউটর ট্রাইব্যুনালকে আরও জানান, এখানে আরেকটি রিপোর্ট আছে, সেটি আসামী যে নির্বাচনী এলাকার এমপি ছিলেন, সেই এলাকা ঢাকার কামরাঙ্গীচরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ডাক্তার কর্তৃক স্বাক্ষরিত।

তখন ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান মো গোলাম মোর্তুজা মজুমদার বলেন, আদৌ এই ডাক্তারের অস্ত্বিত্ব আছে কিনা? কোর্টের অনুমতি ব্যতীয় এই রিপোর্ট দেয় কিভাবে? রিপোর্ট দেখে ট্রাইব্যূনাল মন্তব্য করেন যে, রিপোর্টে উল্লেখ আছে যে আসামীর গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সার। এই নামে কোনো রোগ সম্পর্কে কোর্ট অবগত না বলে মন্তব্য করেন।

শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর সাংবাদিকদের বলেন, এভারকেয়ার হাসপাতালে বন্দিদের জন্য কোনো প্রিজন সেল নেই। বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে চিকিৎসা নিতে বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন হয়। এছাড়া চিকিৎসার ব্যয় বহনের বিষয়েও আদেশে কোনো নির্দেশনা ছিল না। এমনকি চলতি বছরের ১২ ও ১৫ ফেব্রুয়ারির দুটি মেডিকেল প্রতিবেদন জমা দেয় আসামিপক্ষ, যা সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছে। কারণ ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কারাগারে রয়েছেন কামরুল ইসলাম। এ অবস্থায় ট্রাইব্যুনালের অনুমতি ছাড়া তিনি কীভাবে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে এসব প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, একটি কাগজে ‘গ্যাসট্রিক ক্যানসার’ উল্লেখ রয়েছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রচলিত কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। এছাড়া প্রতিবেদনটি একটি প্রত্যন্ত এলাকার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিকিৎসকের নামে দেওয়া। আরেকটি প্রতিবেদন আনা হয়েছে সিঙ্গাপুর থেকে। দুটি প্রতিবেদনই আবেদনের সঙ্গে জমা দিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

তিনি প্রশ্ন রাখেন, রোগীকে না দেখে কিংবা তিনি ডাক্তারের কাছে না গিয়ে কি করে এই চিকিৎসাপত্র ট্রাইব্যুনালে আনলেন। কারণ দুটি কাগজই আমার কাছে এক ধরনের বানানো মনে হয়েছে। অথবা এসব কাগজের যথার্থতা নেই। কারণ ১৫ ফেব্রুয়ারির ডাক্তারি প্রতিবেদনটি কামরুল ইসলামের নির্বাচনী এলাকা কামরাঙ্গীরচরের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের। সেখানকার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক চিকিৎসকের প্রতিবেদন।

এদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী আফতাব মাহমুদ চৌধুরী বলেন, তারা কোনো ভুয়া কাগজপত্র জমা দেননি। প্রতিটি মেডিকেল সার্টিফিকেটেই চিকিৎসকের বিএমডিসি নম্বর রয়েছে।

সিঙ্গাপুরের রিপোর্টের ব্যাখ্যা দিয়ে এই আইনজীবী জানান, সাবেক খাদ্যমন্ত্রীর কিছু টেস্ট বাংলাদেশে সম্ভব নয় জানিয়ে সেগুলো নিজ খরচে সিঙ্গাপুর থেকে করিয়ে আনতে তারা নিম্ন আদালতে আবেদন করেছিলেন। এরপর আদালতের আদেশে জেল কর্তৃপক্ষ আসামিকে স্যাম্পল দিতে হাসপাতালে পাঠায়। পরে যথাযথ প্রক্রিয়ার সেই স্যাম্পল সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘যে কেস হিস্ট্রিটা দেওয়া হয়েছে, সেটা কোনো মেডিকেল রিপোর্ট নয়। উনার কী কী সমস্যা রয়েছে তার একটি হিস্ট্রি মাত্র। যেহেতু তিনি জেল কর্তৃপক্ষের অধীনে রয়েছেন, তাই ব্যক্তিগতভাবে আমাদের চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ নেই। উনার ছেলেও একজন চিকিৎসক। মূলত ছেলের সঙ্গে পরামর্শ করেই এই কেস সামারি দেওয়া হয়েছে।’

এর আগে, গতকাল মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলামসহ দুজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলার অপর আসামি ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। দুজনকেই আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এদিন প্রথমেই আসামিপক্ষের অব্যাহতি আবেদন খারিজ করে দেন ট্রাইব্যুনাল। পরে মামলায় আনা তিনটি অভিযোগ পড়েন বিচারক মোহিতুল হক। এরপর কাঠগড়ায় থাকা কামরুল ও মেননকে অভিযোগ স্বীকার করবেন কিনা জিজ্ঞেস করা হয়।

এ সময় দাঁড়িয়ে ট্রাইব্যুনালকে মেনন বলেন, আমি নির্দোষ। ন্যায়বিচার চাই। তবে এ অভিযোগকে মিথ্যা, বানোয়াট, অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন কামরুল। একইসঙ্গে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন তিনি। পরে অভিযোগ গঠনের আদেশসহ সূচনা বক্তব্যের জন্য আগামী ৯ জুন দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।

প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়, শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন উসকানি দিয়েছেন কামরুল ও মেনন। তারা আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ পদে থেকে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার এবং কারফিউ জারির প্ররোচনা দেন। তাদের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়। ফলে রাজধানীর বাড্ডাসহ আশপাশ এলাকায় ২৩ জন নিহত হন।


 কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!