ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
৬ নবজাতকের মৃত্যু:

আদ-দ্বীন ট্রাজেডিতে অবহেলার প্রমাণ পেলো তদন্ত কমিটি

আমিনুল হক ভূইয়া | জুন ৪, ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম আদ-দ্বীন ট্রাজেডিতে  অবহেলার প্রমাণ পেলো তদন্ত কমিটি
ছবি সংগ্রহ
রাত পোহালেই পবিত্র ঈদুল আজহা। পরিবারের সবার মুখে ছিল আনন্দের হাসি। নতুন অতিথিকে বরণ করে নিতে ঘরে ঘরে প্রস্তুতি ছিল শেষ পর্যায়ে। ছোট্ট শিশুর জন্য কেনা হয়েছিল নতুন কাপড়, দোলনাসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী। স্বজনরা অপেক্ষা করছিলেন নবজাতকের মুখ দেখতে। কিন্তু সেই অপেক্ষা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় এক অসহনীয় শোকে।

ঢাকার মগবাজারে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৭ মে ভোরে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু শুধু ছয়টি পরিবারকেই নয়, নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে। যে ছয়টি শিশুর কান্নায় মুখর হওয়ার কথা ছিল পরিবারের আঙিনা, তাদের নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে ফিরে যেতে হয়েছে বাবা-মাকে। ঈদের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে আজীবনের বেদনায়।

এই মর্মান্তিক ঘটনার তদন্ত শেষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, দায়িত্বরত চিকিৎসক নার্সদের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সামনে তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানান, দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, নার্স স্টাফদের অবহেলা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

আদ-দ্বীন হাসপাতালে  একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু গঠিত তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের  তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন  

তদন্তে উঠে এসেছে, যে পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে নবজাতকগুলো রাখা হয়েছিল সেখানে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ ছিল এবং পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে কক্ষে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এছাড়া নবজাতকদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলেও দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা হয়নি।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, সন্তানদের শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা জানিয়ে অভিভাবকরা বারবার সহায়তা চাইলেও তাৎক্ষণিক সাড়া মেলেনি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স চিকিৎসকদের দ্রুত অবহিত না করে সময়ক্ষেপণ করেন। প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসাও দেওয়া হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রায় ৯০০ বর্গফুটের একটি কক্ষে রোগী, নবজাতক এবং স্বজন মিলিয়ে প্রায় ৫০ জন অবস্থান করছিলেন, যা ছিল ধারণক্ষমতার অনেক বেশি। হাসপাতাল ভবনটিও চিকিৎসাসেবা পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয় বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

আজও ছয়টি পরিবারের ঘরে পড়ে আছে নবজাতকদের জন্য কেনা ছোট ছোট পোশাক, খেলনা আর স্বপ্ন। ঈদের দিনে যখন চারপাশে আনন্দের আমেজ, তখন সেই পরিবারগুলোর ঘরে নেমে এসেছে নীরবতা। যে সন্তানদের কোলে নিয়ে ঈদ উদযাপনের কথা ছিল, তাদের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে কাটছে স্বজনদের প্রতিটি মুহূর্ত।

তদন্ত কমিটির ভাষায়, এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, দায়িত্বে অবহেলা, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক মর্মান্তিক উদাহরণ। এখন স্বজনদের একটাই প্রশ্ন যে ছয়টি প্রাণ আর কখনও ফিরে আসবে না, তাদের মৃত্যুর দায় কারা নেবে?

তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ

ভবনের অনুপযুক্ততা: তদন্ত কমিটি হাসপাতালটি পরিদর্শন করে একমত হয়েছে যে, ভবনটি হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়।

 ভেন্টিলেশন ও অক্সিজেনের ঘাটতি: সংশ্লিষ্ট পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষ ২ পরিদর্শন শেষে কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, কক্ষটিতে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় এবং স্বাভাবিক ভেন্টিলেশন না থাকায় অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল।

দায়িত্বে চরম অবহেলা: কমিটি বলছে, কক্ষের দায়িত্বরত সেবিকা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মৃত নবজাতকদের অভিভাবকদের বক্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, সেবিকাদের দায়িত্বে ‘চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা’ ছিল। নবজাতকের আকস্মিক শারীরিক অবনতির সময় হাসপাতালে সক্রিয় ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্স ছিল না।

 চিকিৎসায় গাফিলতি: প্রতিবেদনে বলা হয় অভিভাবকদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সংশ্লিষ্ট নার্স কোনো চিকিৎসককে বিষয়টি অবহিত না করে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। এমনকি নবজাতকদের মৃত্যু রোধে প্রয়োজনীয় বা উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়নি।

অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি: প্রায় ৯০০ বর্গফুটের ওই কক্ষে সে সময় ১১ জন রোগী, নবজাতক এবং রোগীর স্বজনসহ প্রায় ৫০ জন উপস্থিত ছিলেন, যা ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি।

প্রশাসনিক ব্যর্থতা: তদন্ত কমিটি বলছে, হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা হাসপাতাল পরিচালনার প্রাথমিক শর্তাবলি পালনে ‘সক্ষম ছিলেন না’।

কালের সমাজ/এএইচবি

 

Link copied!