মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, জাতীয়তা যা-ই হোক না কেন, কোনো মানুষকে সীমান্তের খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে চলা কথিত ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে পাঠানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে আটক, বহিষ্কার বা সীমান্তে ফেলে রাখা শুধু মানবাধিকারের লঙ্ঘনই নয়, বরং এটি মানুষের মৌলিক মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ অভিযোগ করেছে যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত বহু মুসলিম বাঙালিকে পর্যাপ্ত আইনি সুযোগ না দিয়েই বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় নারী, শিশু এবং প্রবীণরাও আক্রান্ত হচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বা সীমান্তে আটকে রেখে দিচ্ছে, যা তাদের মৌলিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেন, অবৈধভাবে বহিষ্কার কার্যক্রম বন্ধ করে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা ভারতের দায়িত্ব।
বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২১টি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশে লোকজন ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে। এসব ঘটনায় শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবি এসব প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে বলে জানিয়েছে।
সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মর্মান্তিক। পঞ্চগড় জেলার একটি ঘটনায় ৫ জুন শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হলে দীর্ঘ ৭৫ ঘণ্টার অচলাবস্থা তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেনের ভাষ্যমতে, ওই ব্যক্তিরা প্রথম রাতটি বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে কাটাতে বাধ্য হন। খাদ্য, পানি কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে তাদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ।
রুবেল বলেন, আমি যা দেখেছি, তা ছিল যুদ্ধের মতো এক অচলাবস্থা। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল, আর মাঝখানে আটকে ছিল অসহায় কিছু মানুষ।
একই ধরনের আরেক ঘটনায় ৬ জুন ভোরে দুটি মুসলিম পরিবারের ছয় সদস্যকে বাংলাদেশের সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়। বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দিলে তারা নো ম্যানস ল্যান্ডে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। পরদিন বিএসএফ তাদের আবার ভারতে ফিরে যেতে দেয়।
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই যাদের বাংলাদেশি বলে দাবি করা হচ্ছে, তাদের কাছে ভারতের সরকারি পরিচয়পত্র রয়েছে। কিছু ব্যক্তির ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর পুলিশ তাদের আটক করে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পঞ্চগড়ের বাসিন্দা হাসিবুল ইসলাম জানান, তিনি পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির একটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাদের আধার কার্ড ছিল এবং পরিবারের বয়স্ক সদস্য একাধিকবার ভোটও দিয়েছেন। কিন্তু চলতি বছর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার পর তাদের আটক করা হয় এবং বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।
মানবাধিকার সংস্থাটি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন কার্যক্রম নিয়ে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচনের আগে পরিচালিত নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় ৯০ লাখেরও বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। ফলে বহু মানুষের মধ্যে নাগরিকত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং গ্রেপ্তার কিংবা বহিষ্কারের ভয় তৈরি হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ২০১৯ সালে ভারতের আসাম রাজ্যে পরিচালিত নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার ফলে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব সংকটে পড়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা এখনও অনেক মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে রেখেছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অস্থায়ী আটককেন্দ্রে শত শত কথিত অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে রাখা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশ মুসলিম হলেও তাদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও রয়েছেন। এক ভারতীয় অধিকারকর্মীর মতে, সীমান্তবর্তী অঞ্চলের আটককেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৪০০ মানুষ বর্তমানে অবস্থান করছেন।
অন্যদিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছেন এবং তাদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে এইচআরডব্লিউ বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী কেউ স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চাইলে তাকে সহায়তা করা যেতে পারে, কিন্তু জোরপূর্বক বহিষ্কার কখনো গ্রহণযোগ্য নয়।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া কয়েকজন অভিযোগ করেছেন যে তাদের পরিচয়পত্র, অর্থ ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এমন আচরণ মানবিক ও আইনি উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ সরকারও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত দিয়ে কাউকে ঠেলে পাঠানো হলে তাকে গ্রহণ করা হবে না। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব যাচাই ও দুই দেশের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে বলে তারা মনে করে।
আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ এবং জাতিগত বৈষম্য বিলোপবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের আলোকে এইচআরডব্লিউ বলেছে, ভারত সবার অধিকার সুরক্ষায় বাধ্য। একই সঙ্গে শিশুদের সীমান্তে আটকে রাখা বা বহিষ্কার করা জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদেরও লঙ্ঘন।
মানবাধিকার সংস্থাটির মতে, জাতীয়তা বা ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো মানুষকে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে দিনের পর দিন অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, জাতীয়তা যা-ই হোক না কেন, কোনো মানুষকে সীমান্তের খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়। তিনি ভারত ও বাংলাদেশ-উভয় দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অভিবাসন সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার সময় মানুষের মৌলিক মর্যাদা, অধিকার এবং মানবিক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সীমান্ত শুধু দুই দেশের ভৌগোলিক বিভাজনরেখা নয়; এটি বহু মানুষের জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বাস্তবতা। তাই রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চেয়ে মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হতে পারে এই সংকটের সবচেয়ে কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান।
কালের সমাজ/এবি

