খরচ, খরচ আর খরচ-এই এক শব্দেই যেন আটকে গেছে মানুষের জীবন। বাজারে ঢুকলেই দাম বাড়ার ধাক্কা, আর সেই ধাক্কা সামলাতেই হিমশিম নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে হাসপাতালের বিল, স্কুল-কলেজের ফি, এমনকি যাতায়াত, বাসাভাড়াও। কিন্তু সেই তুলনায় মানুষের আয় বাড়ছে না। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানিসংকট হয়েছে নতুন বোঝা। ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকটে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। যার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে চাকার ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনে। এককথায় বলতে গেলে খরচের ভারে অনেকটা ‘চিড়েচ্যাপ্টা’ মধ্যবিত্ত। সংকুচিত আয় আর লাগামহীন ব্যয়ের প্রভাব কৃষি থেকে শহরের শিল্প, সেবা আর সামাজিক খাতে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, বাজারে কঠোর নজরদারি বাড়ানো, গণপরিবহনে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক নগদ ও খাদ্য সহায়তা, কৃষি ও উৎপাদন খাতে প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন। বর্তমান বাস্তবতা স্পষ্ট সব খাতে খরচের আগুন জ্বলছে, আর সেই আগুনে পুড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়ছে প্রতিনিয়ত, ফলে কষ্টের চাপ দিন দিন আরো গভীর হচ্ছে। দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর নীতি সহায়তা ছাড়া এই চাপ থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি মিলবে না-এটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। তারা এও বলছেন, মজুরি বৈষম্য, বেকারত্ব আর মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে খরচের খাতাকে। তাই সরকারের থাকতে হবে শ্রেণিভিত্তিক সক্ষমতার সঠিক পরিসংখ্যান ও পরিকল্পনা।
তবে ন্যূনতম ডিজেলের অভাব আর কাঠফাটা রোদে পুড়ে যাওয়া সবুজ ক্ষেতের সঙ্গে পুড়ছে কৃষকদের ভাগ্য। শহর আর প্রান্তিকের মানুষের জন্য পণ্যের দাম সমান হারে বাড়া দামে কৃষকদের অসহায়ত্ব আরও তীব্র হয়। গ্যাসের সমস্যা নিত্য। ফলে ওই পথে না হেঁটে মাটির চুলাই ভরসা অনেকের। এলপিজি আর ভোজ্য তেলের দামে চিড়েচ্যাপ্টা ভোক্তার সংকুচিত সক্ষমতা। দোকানির উচ্চ ব্যয়ের সামঞ্জস্য আনতে ধোঁয়া ওঠা গরম পরোটার আকার ছোট হয়ে আসে চারপাশ থেকে। কাঁচাবাজারের মিষ্টি কুমড়াও এখন আর মিষ্টি নয়। দোকানে মাছ থেকে প্রিয় হয়ে উঠেছে কাটা মাথা আর মাছের অংশ বিশেষ। এত গেল খরচের সরাসরি প্রভাব। গত কয়েক বছর ধরেই মধ্যবিত্তরা বাড়ি পাল্টে, শহর পাল্টে খরচের খাতা সহনীয় করতে চান। জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে সেবা ও আমদানি পণ্যের দাম আবারও বাড়বে-এমন কড়া নাড়ছে ঘরের দুয়ারে। ২০২৪ সালে ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ বেকার হয়েছেন। ২০২৫ সালে শিল্প মালিকদের তথ্যে প্রথম ৬ মাসে বেকার ২১ লাখ মানুষ।
জানা গেছে, দেশে রাইড শেয়ারিং খাতে জড়িত অন্তত ১০ লাখ মানুষ। পাঠাও ও উবার মিলিয়ে নিবন্ধিত চালকের সংখ্যা কয়েক লাখ। এই বিশাল কর্মসংস্থানের বড় অংশই এখন জ্বালানি সংকটে অনিশ্চয়তায়। লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতেই তাদের অর্ধেকের বেশি সময় নষ্ট হয়ে যায়। ফলে উপার্জনও আগের চেয়ে সীমিত হয়েছে। এ ছাড়া শপিং মল, মার্কেট সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করে দেওয়ায় ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন। ফলে সীমিত আয়ের মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি দিনদিন খরচের চাপে চ্যাপটা হচ্ছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা শহর-সব জায়গাতেই একই চিত্র। বাজারে গিয়ে অনেকেই প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা কমিয়ে দিচ্ছেন, কেউ কেউ খালি হাতে ফিরছেন। পরিবারের সদস্যদের চাহিদা পূরণ দূরের কথা, নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করাই হয়ে উঠছে কঠিন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকেই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখছেন। আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয়ের স্থবিরতা এবং বাজার অস্থিরতায় থাকা মানুষ এখন নতুন করে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাচ্ছেন। এই মূল্য বৃদ্ধিকে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, দেশে এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, যা প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম বাড়ায় নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিক-সব শ্রেণির মানুষ চাপে পড়েছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছে।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে, কর্মসংস্থানের সুযোগও আগের তুলনায় কম। জীবনযাত্রার মানের অবনতি হয়েছে স্পষ্টভাবে। তবে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. শহীদুল জাহীদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সেখানে মজুরির খরচ বেড়ে যাবে। আর সেটা হলে অনেক প্রবাসী বেকার হবেন। তারা দেশে ফিরবেন। তাহলে গত এক বা দেড় বছর আগে যে অবস্থা ছিল, এর চেয়ে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হতে পারে। সরকারি সংজ্ঞায়, খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভূত পণ্য বা সেবা ক্রয়ে প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮২২ টাকা খরচের সামর্থ্য যদি না থাকে, তাহলে তারা দরিদ্রসীমার নিচে চলে যাবেন, যা বর্তমান বাজারে এক মাসের গ্যাস বা এলপিজির দাম, পানি বা বিদ্যুৎ বিল বা ভোজ্য তেলের যোগফলের কম।
২০২৪-২৫ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, গত কয়েক বছরে মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় আয়ের ৪২ শতাংশ এখন খরচ করতে হচ্ছে শুধু খাদ্যসামগ্রীতে। বাকি ৫৮ শতাংশ দিয়ে মেটাতে হয় শিক্ষা, পরিবহন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও পরিসেবা ব্যয়। সংস্থাটির হিসাবে, একটি পরিবারের খরচ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা ধরা হয়। একই সময়ের সার্ভিস রুলস হিসাবে ৬ সদস্যের পরিবারে ন্যূনতম খরচে প্রয়োজন অন্তত ৫৯ হাজার টাকা। সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও কৃষকের আয় বা বেতন স্কেল এক না হলেও একই বাজারে সমান দৌড় প্রতিযোগিতার রেসে নামতে হয় দরিদ্র, অতিদরিদ্র, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, যারা এরইমধ্যে গরিব, তারা দরিদ্রসীমা থেকে আরও নিচে চলে যাবে। ২০২২ সালে দারিদ্র্য হ্রাসের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসলেও ২০২৫ সালে তা আবারও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে সংকুচিত আয়ের সঙ্গে সব শিশুদের স্কুলে ধরে রাখা যায়নি।এমনকি পরিবারগুলোর খাদ্য পুষ্টিতে আপস করায় দেশের সার্বিক উৎপাদশীলতাকেও ভবিষ্যতে আঘাত করবে।
কালের সমাজ/এসআর

