ঢাকা বুধবার, ০৮ এপ্রিল, ২০২৬, ২৪ চৈত্র ১৪৩২

হামে বাড়ছে শিশু মৃত্যু,অভিভাবকদের উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক | এপ্রিল ৭, ২০২৬, ১০:০২ পিএম হামে বাড়ছে শিশু মৃত্যু,অভিভাবকদের উদ্বেগ

দীর্ঘদিন পর দেশজুড়ে হঠাৎ বাড়তে থাকা হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রোগ শনাক্তে ধীরগতি এই উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। বেশিরভাগই উপসর্গ নিয়ে ‘সন্দেহজনক’ হামে প্রাণ হারাচ্ছে। আর মৃতদের মধ্যে ৯২ শতাংশই শিশু। এ অবস্থায় হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার এরইমধ্যে জরুরি ভিত্তিতে ৫৬টি জেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। তবে হামে শিশুদের মৃত্যু বেশি হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এর আওতায় ৩০টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যক্রম জোরদার, হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। হামের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জনসাধারণকে জানাতে ইনফোগ্রাফিক ও জনসচেতনতামূলক প্রচারও চালানো হচ্ছে। কিন্তু রোগী শনাক্ত ও আক্রান্তের সমন্বিত তথ্য না থাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। আর এর মধ্য দিয়েই আবারও সামনে এসেছে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা। একইসঙ্গে টিকাদান কর্মসূচির জন্য দাতা সংস্থার অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীলতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচি চালু হওযার পর দেশে হামে মৃত্যুর সংখ্য ছিল না বললেই চলে। বিশেষ করে ২০২০ সাল থেকে দেশে হামে মৃত্যুর কোনো রেকর্ড নেই। হঠাৎ হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ টিকাদান কর্মসূচির কভারেজ ধস। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে টিকাদানের হার ছিল ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২২ সালে তা উঠে যায় ১০৩ দশমিক ৬ শতাংশে। ২০২৪ সালে নেমে আসে ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশে। আর ২০২৫ সালে বড় ধস নেমে তা দাঁড়ায় ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকারি হিসাবে ১৫ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ২১ জন, আর একই সময়ে ‘সন্দেহজনক হাম’ বা  হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১২৮ জনের। এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন জেলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে—মৃতদের মধ্যে প্রায় ৯২ দশমিক ৮৬ শতাংশই শিশু, যাদের বড় একটি অংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। এছাড়া হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন হাজারো রোগীর বেশিরভাগও শিশু হওয়ায় পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি সতর্কবার্তা দিচ্ছে। গত ৬ এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীর পাঁচটি হাসপাতালসহ ৬৪টি জেলায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া এবং চিকিৎসাধীন রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মৃতদের মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশের বয়স শূন্য থেকে ৫ বছর এবং ১২ দশমিক ২৬ শতাংশের বয়স ৫ থেকে ১৮ বছর। বাকি ১৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক। আর সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন রোগীর মধ্যে বেশিরভাগই শিশু।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা নয় হাজার ৮৮৩ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা ২২৪ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা এক হাজার ৩৯৮ জন। এসময়ে সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ছয় হাজার ৮৮৩ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে চার হাজার ৬৩৫ জন। মৃত্যুর হিসাবে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে সবচেয়ে বেশি ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। একই সময়ে জেলার তালিকাতেও ঢাকায় সর্বোচ্চ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।

রাজধানীর পাঁচটি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে হাম-সংক্রান্ত জটিলতায় মারা গেছে ৩ শিশু। এখানে রোগী ভর্তি রয়েছে ২৭৭। মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেও হাম রোগীদের জন্য একটি ওয়ার্ড নির্ধারিত হয়েছে। যেখানে ভর্তি আছে ৪২ জন। এখানে কারো মৃত্যু হয়নি। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে মার্চ ও এপ্রিল মাসে ৮০৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৮ জন মারা গেছে। বর্তমানে ৬২ শিশু চিকিৎসাধীন।

শহীদ সোহরাওয়াার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দিন বলেন, বর্তমানে হাম আক্রান্ত ১০০ জন চিকিৎসাধীন। আক্রান্ত সবাই শিশু। যাদের বেশিরভাগের বয়স এক বছরের নিচে। হাম আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে ২ শিশুর। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত ৬১ শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। এ হাসপাতালে এ পর্যন্ত চার শিশু মারা গেছে।

 

হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল হক বলেন, ৬০টি বিশেষ শয্যায় রোগী ভর্তি আছে। এর বাইরে একক কেবিন, আইসোলেশন ওয়ার্ডেও শিশুদের ভর্তি করতে হচ্ছে। যে শিশুদের ভর্তি না করলে অন্য হাসপাতালে যেতে যেতে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে, তাদের ফিরিয়ে দেওয়ারও উপায় থাকে না।


রাজধানীর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড) ছাড়া সব হাসপাতালে বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এছাড়া দেশের সব মেডিকেল কলেজ ও সব সরকারি হাসপাতালে বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড চালু হয়েছে।

 

যেসব জেলায় মৃত্যু হয়েছে-টাঙ্গাইল জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশু মারা গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছে ১৩ মাস বয়সী সাফা এবং ৮ মাস বয়সী সাইফান। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালে ২৩ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য পাওয়া যায়নি।  ময়মনসিংহ জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে সাত শিশু মারা গেছে। এসব শিশুর ৯০ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। হামে আক্রান্ত হয়ে সেখানে চিকিৎসা নিয়েছে ১৮১ জন। রাজশাহী বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে ১১ শিশু মারা গেছে। হামে আক্রান্ত ও হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৯৬২ জন।  চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনায় রোগীর সংখ্যা বেশি। এ দুই জেলায় আক্রান্তদের মধ্যে ৯ মাসের কম বয়সের শিশুর সংখ্যা বেশি।  বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১০ মাস বয়সী এক শিশু। কিন্তু শিশুটির শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহের জন্য অভিভাবকদের সম্মতি না পাওয়ায় পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. খুরশিদ আলম জানান, গত এক মাসে উপজেলার ৩৬ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে হামের রোগীদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু রয়েছে। সেখানে ১০ শিশু চিকিৎসাধীন। নাটোরে হামে আক্রান্ত হয়ে কাসফি নামে ৩ মাস বয়সী এক ছেলে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ জেলায় সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ৪৯ জন। নওগাঁ জেলায় এখন পর্যন্ত এক ছেলে শিশু মারা গেছে। নওগাঁ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই জন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৫ শিশু মারা গেছে। তাদের মধ্যে ৪ জনের বয়স ৯ মাসের নিচে। ১ জনের বয়স ২ বছর ৪ মাস। মৃত্যুর সব ক্ষেত্রে হামের স্পষ্ট লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা গেছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে ৫৫ শিশু হাসপাতালে ভর্তি আছে, যাদের সবার হামের উপসর্গ রয়েছে। এ পর্যন্ত জেলায় মোট ৩৬৪ শিশু আক্রান্ত হয়েছে। গোপালগঞ্জ জেলায় ১০ মাস বয়সের ১টি কন্যা শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। জেলার সিভিল সার্জন আবু সাঈদ মোহাম্মদ ফারুক জানিয়েছেন, এটি এ জেলায় হামে মৃত্যুর একমাত্র ঘটনা। জেলায় বর্তমানে ১৯ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। যারা হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে।

 

এ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৯১ শিশু আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৩ জনের হাম ধরা পড়েছে। নারায়ণগঞ্জে হামে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ২টি ছেলে শিশু মারা গেছে। এদের একজনের বয়স এক, অন্যজনের দুই বছর। ঈদ পরবর্তী সময়ে এ পর্যন্ত ৯ জন চিকিৎসা নিয়েছে। বর্তমানে কেউ হাসপাতালে ভর্তি নেই। বরিশালের বিভাগের ৬ জেলায় এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে ৫ জন এবং নিশ্চিত হামে ৪ জন মারা গেছে। মৃতদের মধ্যে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বাকিরা ঢাকায় মারা গেছে। তবে ঠিকানা অনুযায়ী মৃত্যুর তথ্যে তাদের হিসেব দেখানো হয়েছে। যার মধ্যে শিশু ছাড়াও বয়স্ক পুরুষ রয়েছেন। এছাড়া এ বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৫৯৩ জন। যার মধ্যে ৪২০ জন সন্দেহজনক হাম রোগী বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মোট সন্দেহজনক রোগীর মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ পর্যন্ত ৬৩ জন নিশ্চিত হাম রোগী বরিশাল বিভাগে শনাক্ত হয়েছে। শরীয়তপুরে হামে আক্রান্ত হয়ে ২ জন মারা গেছে। সেখানে বিভিন্ন হাসপাতালে ১৪ জন রোগী হামের চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ, বাকি সবাই শিশু। মাদারীপুরে হামে আক্রান্ত হয়ে আদিবা নামে ৩ মাস বয়সী এক শিশু মারা গেছে। এ জেলায় এ পর্যন্ত ২৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন। লক্ষ্মীপুরে হামের প্রকোপ কম। এ জেলায় নুসাইবা নামে ৯ মাস বয়সী এক শিশু মারা গেছে।

এছাড়া এ বছর এখানে মাত্র ৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। নেত্রকোনা জেলায় এ পর্যন্ত ১০ জন ল্যাব কনফার্ম পজিটিভ হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে ৩৯ জন সন্দেহজনক হাম রোগী ভর্তি আছে। যশোর জেলায় এ বছর পরবর্তী বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মোট ১৩ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে দেড় বছর বয়সী ১ জন, ৩ বছর বয়সী ১ জন, ৫ বছর বয়সী ১ জন, ১৬ বছর বয়সী ১ জন, ৩২ থেকে ৫৫ বছর বয়সী ৮ জন এবং ৭০ বছর বয়সী একজন আছেন। তাদের মধ্যে নারী ৬ জন, পুরুষ ৪ জন এবং শিশু ৩ জন। বর্তমানে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ৩৮ জন চিকিৎসাধীন। কুষ্টিয়া জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে আফরান নামে ৮ মাস বয়সী ১ শিশু মারা গেছে। এ বছর কুষ্টিয়া সদর ও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপতাল এবং ৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামের লক্ষ্মণ নিয়ে ২৮৪ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। রংপুর জেলার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরাসরি হামে কেউ মারা না গেলেও হাম পরবর্তী অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৬ জন মারা গেছেন। ভর্তি হয়েছেন ৩৩১ জন। নীলফামারী জেলায় ১১ দিন বয়সী নবজাতক আফরিন জান্নাত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এছাড়া ৬ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের তথ্যে জানা যায়, এ জেলায় রাফি (৫), আয়েশা সিদ্দিকা (৬) এবং সাওয়ান (৯) নামে ৩ শিশু মারা গেছে। হাম সন্দেহে ৮৭ জন রোগী বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

 

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, মোট হাম রোগীর সংখ্যা ১২ জন। সবাই শিশু। কক্সবাজার জেলায় মারা গেছে ৫ জন। তাদের মধ্যে আয়েশা ছিদ্দিকার বয়স ৫ মাস, সাফওয়ানের ৯ মাস, রুসফির ৭ মাস, জেসিনের ৯ মাস এবং রাফিজার ৭ মাস। চিকিৎসাধীন আছেন ৩১ জন। কুমিল্লা জেলায় হাম সন্দেহে ৩ শিশু মারা গেছে। মোট আক্রান্ত ৯৫ জন। চাঁদপুর জেলায় হামের প্রাাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় এ পর্যন্ত তিনজন শিশু মারা গেছে। চাঁদপুর সদর ও জেলার ৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখন পর্যন্ত ২৭ জন শিশু আইসোলেশনে ভর্তি রয়েছে। সিলেটে হামে আক্রান্ত হয়ে দুই মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির এ তথ্য নিশ্চিত করেন। সিলেট বিভাগে হাম ও রুবেলা রোগী হিসেবে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬ জন শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে ৪৪ জন সন্দেহজনক রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ মাস বয়সী রাহিমা মারা গেছে। জেলার হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল ও বিভিন্ন বেসরকারী হাসপাতালে বর্তমানে ৪১ জন শিশু চিকিৎসাধীন। মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯ জনে। যার মধ্যে অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।

 

অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবে বাড়ছে হাম: হামের প্রকোপ বাড়ার প্রধান কারণ হলো টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন এবং অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব। শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা সময়মতো নেওয়াই এ রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এছাড়া মৌলভীবাজার জেলাতেও হামে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। এ জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে আটজন চিকিৎসাধীন আছে। তাদের মধ্যে ৬ জন শিশু ও ২ জন পুরুষ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় হামে এ পর্যন্ত কারো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫১ জন ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে ৭ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে। জামালপুরে হামে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা না গেলেও হাম সন্দেহে ৮ শিশু হাসপাতালে ভর্তি আছে। এ জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা কম। চুয়াডাঙ্গা জেলায় হামে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তবে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩ শিশু হাসপাতালে ভর্তি আছে। তাদের মধ্যে ২ জন মেয়ে ও ১ জন ছেলে শিশু। কুড়িগ্রাম জেলায়ও কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। এ পর্যন্ত এ জেলায় ১৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তার মধ্যে ৩ জন হামে আক্রান্ত ছিলেন। 
তারা ৩ জনই সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে গেছেন। তাদের মধ্যে শিশু নেই। দিনাজপুর জেলায় কেউ মারা যায়নি। তবে হাম সন্দেহে ১টি ছেলে ও ১টি মেয়ে শিশু চিকিৎসাধীন আছে। লালমনিরহাট জেলা থেকে এখন পর্যন্ত কারো মৃত্যুর খবর আসেনি। তবে এ জেলার জেলার ৫টি উপজেলা হাসপাতালে ১২ জন চিকিৎসাধীন। সবাই শিশু। সবার বয়স ৫ বছরের নিচে। জয়পুরহাট জেলায় হামে এ পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। জেলা সদর হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৬ জন শিশু বর্তমানে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে কেউই গুরুতর অবস্থায় নেই। জয়পুরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রাশেদ মোবারক জুয়েল বলেন, হামের প্রকোপ বাড়ার প্রধান কারণ হলো টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন এবং অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব। তিনি সতর্ক করে বলেন, শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা সময়মতো নেওয়াই এ রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

দেড় দশকে দেশে হামে সর্বোচ্চ মৃত্যু: চলতি বছরে হামে যত মৃত্যু হয়েছে, তা গত দেড় দশকে সর্বোচ্চ। এ সময়ে পাঁচবার হামে মৃত্যুর ঘটনা জানা যায়। ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি মারা যায় ১০ জন। ডব্লিউএইচওর দেওয়া বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, ২০০৪ সালে দেশে ৯ হাজার ৭৪৩টি হাম রোগীর তথ্য পাওয়া যায়। পরের বছর বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৯৩৪ জনে। এরপর ২০০৬ সালে তা নেমে আসে ৬ হাজার ১৯২-এ। ২০০৭ সালে ২ হাজার ৯২৪, ২০০৮-এ ২ হাজার ৬৬০, ২০০৯-এ ৭১৮, আর ২০১০ সালে ৭৮৮। অর্থাৎ ২০০৪ থেকে ২০০৫-এর ভয়াবহ অবস্থার পর আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত কমে আসে। ২০১১ সালে দেশে হাম রোগীর সংখ্যা আবার লাফ দিয়ে ৫ হাজার ৬২৫-এ ওঠে। ২০১২ সালে তা ১ হাজার ৯৮৬-এ নেমে আসে। ২০১৩ সালে ২৩৭, ২০১৪ সালে ২৮৯, ২০১৫ সালে ২৪০-এ তিন বছর তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে আবার আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয় ৯৭২।
 

কালের সমাজ/ কে.পি

Link copied!