আর মাত্র চার দিন পালিত হবে মুসলিম ধর্মাবলম্বীর ত্যাগের উৎসব। এর মধ্যে হাটগুলোতে পশু আসলেও বিক্রি সেভাবে শুরু হয়নি। বিভিন্ন কারণে অনেক ক্রেতা হাট-বিমুখ হচ্ছেন। তারা ভরসা রাখছেন খামারে। সেখানে সরাসরি ওজন করে দেখানো হচ্ছে পশুকে। নিচ্ছেন পছন্দমত। হাটে না যাওয়ার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ইজারাদারের লোকজন ও দালাল কর্তৃক নানাভাবে হয়রানির শিকার হওয়া। হাটের ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে পশু কিনতে ক্রেতারা যাচ্ছেন খামারে।
রাজশাহী জেলা ও মহানগরীতে ছোট ও বড় মিলিয়ে খামার আছে ২৬ হাজার ২৩৪টি। রাজশাহীতে বেশ কয়েকটি বড় খামারও আছে। এসব খামারে ওজন করে বিক্রি হচ্ছে গরু। আর ছোট খামারের গরুগুলো দেশের বিভিন্ন হাটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এসব খামারে শাহীওয়াল, দেশাল, অ্যালবিনো, বাফেলো, হাশা গরু, উলবাড়ি গরু, নেপালি গরু, ভুট্টি গরু পালন করা হয়। খামারগুলোতে এক লাখ থেকে ১০০ লাখ টাকা দামে গরুও আছে। এসব খামারে ৫৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে গরু।
এসব খামারে প্রতিদিন ক্রেতাদের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। পছন্দ হলে ওজন স্কেলে উঠিয়ে পরিমাণ দেখে খামারেই গরু রেখে যাচ্ছেন। ইদের এক দিন বা দুই দিন আগে গরু নিয়ে যাবেন। অন্য জেলার পাইকাররাও নিচ্ছেন এসব খামার থেকে। তবে এভাবে গরু বিক্রি করে ক্রেতা-বিক্রেতা লাভবান হলেও রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। ক্রেতারা বলছেন, ওজন স্কেলে গরু বেচাকেনায় সুবিধা অনেক। ওজন স্কেলে গরু মেপে বেচাকেনার কারণে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে ঠকে যাওয়ার চিন্তা নেই। বাজেট অনুযায়ী সুস্থ-সবল পশু কিনতে পারছেন তারা।
খামারিরা বলছেন, এবার বড় গরুর তুলনায় মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি। ইতোমধ্যে রাজশাহীর বিভিন্ন খামারের প্রায় ৬০ শতাংশ কোরবানির পশু বিক্রি হয়ে গেছে। অনেকেআগে থেকে কিনে রেখেছেন ইদের আগে নিয়ে যাবেন। আবার পরিবহনের নিজস্ব গাড়িও রাখা হয়েছে। গোখাদ্য, ওষুধ, শ্রমিক ও পরিচর্যা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবার গরু পালনে খরচ অনেক বেড়েছে। সেই কারণে আগের বছরের তুলনায় অনেক খামারে গরুর সংখ্যাও কমানো হয়েছে।
রাজশাহীর কয়েককটি খামার ঘুরে দেখা যায়, কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরে ঘুরে গরু দেখছেন; কেউ আবার দাঁত, ওজন, খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দরদাম করছেন। অনেকেই পছন্দের পশু আগাম বুকিং দিয়ে রাখছেন। চাকরিজীবি শামসুল ইসলাম বলেন, হাটে গেলে ভিড়ের মধ্যে ভালোভাবে দেখা যায় না। এখানে সময় নিয়ে দেখে কেনা যায়। হাটে গেলে তুলনা করা সহজ হয়। খামারে দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে। তারপরও গরম আর ভিড় এড়াতে খামারে এসেছি।
মাহফুজুর রহমান বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এবার সীমিত বাজেটের মধ্যেই কোরবানি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি। তবে বড় গরুর দাম এখন নাগালের বাইরে। তাই ৮০ হাজার থেকে এ লাখ টাকার মধ্যে মাঝারি গরুই খুঁজছি।
এসজে পদ্মা এগ্রোর মালিক মেহরাব হোসেন বলেন, আগে আমরা ২০০ থেকে ৩০০ গরু প্রস্তুত করতাম। এবার গরুর সংখ্যা কমিয়ে নিয়ে এসেছি। বেশিরভাগ আগেই বুকিং হয়ে গেছে। ওজনে যে দাম সেটাই রাখা হয়েছে। গেলবারের চেয়ে এবার দাম বেড়েছে।
রাজশাহীর সর্ববৃহৎ পশুর হাট সিটিহাট। প্রতি রোববার ও বুধবার এই হাট বসে। বুধবার দুপুরে হাট ঘুরে দেখা গেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় গরুর আমদানি কম, দামও বেশি চাওয়া হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে এই হাটে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকারদের পাশাপাশি স্থানীয় ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ্য করা গেলেও এবারে তেমনটা চোখে পড়েনি। হাতেগোনা কিছু পাইকারের দেখা মিললেও কেনা-বেচা আগের মতো নেই।
হাটে দেখা যায়, গেল বছর যে গরু ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকায় কেনা যেত, এবারে সেই গরু কিনতে হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ হাজার টাকায়। গরু কিনতে ঢাকা থেকে আসা পাইকার ফয়েজ উদ্দিন ব্যাপারী ও জুনায়েদ আহম্মেদ জানান, অন্যান্য বছরে কোরবানির ইদের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা এসে রংপুরের হাটগুলো থেকে গরু কিনে নিয়ে যেত। এবারে সেই সংখ্যা একেবারেই কম।
এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, হাট ইজারাদারের লোকজন কর্তৃক হাসিল বা খাজনার নামে জোর করে বেশি টাকা আদায়, দালালদের উৎপাত ছাড়াও পরিবহন খরচ আগে চেয়ে বেশি হওয়ায় পাইকাররা আগ্রহ হারিয়েছেন। এ বছর এখনো বেশি হাসিল আদায় না হলেও দালালদের অসহনীয় উৎপাত আছে। তবে বিক্রেতারা আগেভাগে কিনতে আসায় বিক্রেতারা গরুর দাম ছাড়তে রাজি হচ্ছেন না বলেও জানান তারা।
সিটিহাটের ইজারাদার শওকত আলী বলেন, ইদ আসন্ন হলেও হাটে এবারে এখন পর্যন্ত গরুর আমদানির পাশাপাশি ক্রেতাও কম। বুধবার হাটে গরু উঠেছিল ৪ থেকে ৫ হাজার। এর আগের হাটে বেশি গরু এসেছিল। তবে আগামী রোববার থেকে হাটে বিক্রি জমে উঠবে বলে আশাকরি। রোববারের পর প্রতিদিন হাট বসবে।
অন্যদিকে, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যমতে, রাজশাহী বিভাগে এ বছর প্রস্তুত করা হয়েছে মোট ৪৩ লাখ কোরবানির পশু, যেখানে চাহিদা রয়েছে ২৪ লাখের মতো। ফলে এই অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ১৯ লাখ পশু দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হবে।
রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমান বলেন, এই বছরও রাজশাহী জেলায় চাহিদার তুলনায় প্রায় ৯১ হাজার ৯৫৩টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এই উদ্বৃত্ত পশুগুলো দেশের বিভিন্ন হাটে চলে যাবে। আশা করা হচ্ছে খামারিরা তাদের ন্যায্য মূল্য পাবেন। হাটগুলোতেও খামারিদের পশু কেনাবেচায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
কালের সমাজ/কে.পি

