ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই, ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

মহম্মদপুরে কাজী বাড়ির কাচারি ঘর

হাসনাত হান্নান তামিম, মহম্মদপুর (মাগুরা) | জুলাই ১, ২০২৬, ০৯:০০ পিএম মহম্মদপুরে কাজী বাড়ির কাচারি ঘর

স্মৃতির কপালে টিপ পরিয়ে গ্রাম-বাংলার বুক থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে ছনের কাচারি ঘর। আধুনিকতার করাল গ্রাসে যেখানে বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ আভিজাত্যের এই চিরচেনা প্রতীক, সেখানে ব্যতিক্রমী এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার ওমেদপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী কাজী বাড়ি। বহু সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা আর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই বাড়ির প্রায় ৮৫ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ‘ছনের কাচারি ঘর’।

ফিরে যাওয়া যাক ১৯৪৩ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামার সেই সময়ে তৎকালীন বৃহত্তর যশোর জেলার ডিস্ট্রিক্ট জুরি বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ও জমিদার কাজী হবিবর রহমানের উদ্যোগে ও সযত্ন্ন প্রচেষ্টায় নির্মিত হয়েছিল বিশালাকারের চার চালা বিশিষ্ট এই কাচারি ঘরটি। যার সামনে রয়েছে একটি প্রশস্ত বারান্দা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্থানীয়রা আলাপ-আলোচনা করতেন এই কাচারি ঘরে বসে। ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও সর্বশেষ স্বাধীন বাংলাদেশের সময়েও কাজী বাড়ির ঐতিহ্যবাহী কাচারি বাড়ি স্বমহিমায় ভাস্কর হয়ে আছে।

১৯৫৬ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পরও এই ঘরটি রূপ নিয়েছিল গ্রামীণ সালিশ-বিচার আর আড্ডার প্রাণকেন্দ্রে। ১৯৭৮ সালে ৯৪ বছর বয়সে জমিদার কাজী হবিবর রহমানের মৃত্যুর পর এটির রক্ষণাবেক্ষণের হাল ধরেন তাঁর মেঝ ছেলে কাজী মোসলেহ উদ্দিন মুরাদ। তিনি প্রায় ৩০ বছর এই স্মৃতি আগলে রাখেন। বর্তমানে গত দেড় যুগ ধরে এই ঐতিহ্যকে পরম মমতায় টিকিয়ে রেখেছেন মুরাদ কাজীর আরেক ভাই মাওলানা কাজী মো. মফিজ উদ্দিন।

মহম্মদপুরের নিভৃত ওমেদপুর গ্রামের কাজী বাড়ির সেই পুরোনো কাচারি ঘরটি আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে; ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে। ১৯৪০ সালে কাজী হবিবুর রহমান এটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ এই মানুষটি নিজের জমিতে ছনের আবাদ করেন এবং কলকাতা থেকে মিস্ত্রী এনে, ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন এই কাচারি ঘর। নির্মাণ শেষে ১৯৪৩ সালে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

শুরু থেকেই এই ঘরটি হয়ে ওঠে গ্রামের মানুষের মিলনকেন্দ্র। সেখানে বসেই মানুষ খবর নিতেন, সিদ্ধান্ত নিতেন, আর জীবনকে গুছিয়েও নিতেন। তখন ঘড়ির প্রচলন সীমিত ছিল; এই কাচারি ঘরই ছিল সময় বোঝার ভরসাস্থল। বিয়ের লগন ঠিক করা হোক বা কৃষি কাজের সময় নির্ধারণ; সবই চলত এখানে বসে, আলোচনার মাধ্যমে।

রাত হলে দূর পথের পথিকেরা এখানে আশ্রয় নিতেন। রমজান মাসে এখান থেকেই আজানের মাধ্যমে আশপাশের গ্রামে ইফতারের সময় জানানো হতো। একজন ইমাম নিয়োগ করা হতো, যিনি নামাজ পড়াতেন এবং তারাবির দায়িত্বও পালন করতেন। ফলে এটি হয়ে উঠেছিল ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই কাচারি ঘরে বসেই গ্রামের যুবকরা যুদ্ধের খবর নিয়ে আলোচনা করত। আর ১৯৪৬ সালের ১৫ মার্চ, যখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি; ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দেন, সেই খবরও এই ঘরে বসে রেডিওর মাধ্যমে শোনা যায়। খবর শুনে মানুষ একদিকে বিস্মিত, অন্যদিকে নতুন স্বাধীনতার স্বপ্নে আলোড়িত হয়ে ওঠে। আজ সময় বদলেছে, কিন্তু ওমেদপুর কাজী বাড়ির সেই কাচারি ঘর এখনো দাঁড়িয়ে আছে; গ্রামের স্মৃতি, মানুষের গল্প আর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে।

সময়ের পরিক্রমায় আর বর্তমান বাস্তবতায় ছনের এমন কাচারি ঘর খুঁজে পাওয়া প্রায় দুষ্কর। এক সময় কাচারি ছাউনি ছাওয়ার জন্য নিজেদের খেতেই ছনের আবাদ হতো। কিন্তু এখন ছন পাওয়া যেন আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো কঠিন। তাই বলে কি পূর্বপুরুষের স্মৃতি মুছে যাবে? কক্ষনো না। কাজী পরিবার বংশানুক্রমে সেই ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছেন। এখন দূরবর্তী মাদারিপুর জেলার শিবচর উপজেলা থেকে অনেক কষ্ট ও ব্যয়ে ছন সংগ্রহ করে এনে নতুন করে ছাওয়া হয় এই ঘর।

এক সময় গ্রামীণ জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই কাচারি ঘর বা বৈঠকখানা। এটি শুধু এক টুকরো স্থাপত্য নয়, বরং ছিল বাঙালি সংস্কৃতির এক অনন্য সামাজিক মেলবন্ধন। পথিক বা মুসাফিরদের ক্লান্তি দূর করার আশ্রয়স্থল, ভবঘুরে বা জায়গিরদের রাত্রিযাপনের ভরসা, কিংবা রাতে পাড়ার কিষানদের জড়ো হয়ে পল্লিগীতি, ভাটিয়ালী, রূপবান বা বেহুলা-লখিন্দরের পালাগানের আসর; সবকিছুর সাক্ষী এই আঙিনা।

গভীর রাত পর্যন্ত চলা সালিশ বৈঠকে চা-নাস্তা আর পানের ফরমায়েশ খাটতে খাটতে বাড়ির অন্দরমহলের (ভেতরের) মানুষগুলোর চোখেও ঘুম থাকত না। এই কাচারি ঘরগুলোই বাঙালিদের শিখিয়েছিল অকৃত্রিম অতিথিপরায়ণতা। কাচারির সামনের বারান্দার হেলনা বেঞ্চে বসে ক্লান্ত পথিকের একটু জিড়িয়ে (বিশ্রাম) নেয়া কিংবা হুক্কা খাওয়ার সেই দৃশ্য আজ কেবলই অতীত।

স্থানীয় প্রবীণ ও সচেতন নাগরিকরা আফসোসের সুরে বলেন, কাচারি ঘরের বিলুপ্তি মানে কেবল একটি ঘরের বিলুপ্তি নয়, এটি আমাদের গ্রামীণ সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কৃতিরই অবক্ষয়। আগে গ্রামের অভ্যন্তরীণ বিরোধগুলো এই কাচারি ঘরেই মিটে যেত; এখন তা ঠাঁই নেয় থানা কিংবা আদালতে। ফলে দুর্বল হয়ে পড়েছে পারিবারিক বন্ধন ও সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রথা। নতুন প্রজন্মের অনেকেই আজ জানেন না কাচারি ঘর আসলে কী। ঐতিহ্যবাহী ছনের এই কাচারি ঘরকে টিকিয়ে রাখা না গেলে আগামী প্রজন্মের কাছে কেবলই রূপকথার গল্প হয়ে টিকে থাকবে।

দেশজুড়ে যখন ঐতিহ্য রক্ষার হাহাকার, তখন মহম্মদপুরের কাজী বাড়ির সদস্যরা দীর্ঘ ৯৫ বছর ধরে তাঁদের এই কাচারি ঘরটি অক্ষত ও অটুট রেখেছেন। আজও দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ গ্রামীণ জীবনের এই জীবন্ত ইতিহাস দেখতে ছুটে আসেন মহম্মদপুরে নিভৃত ওমেদপুর গ্রামে।

প্রয়াত জমিদার কাজী হবিবর রহমানের পুত্র মাওলানা কাজী মো. মফিজ উদ্দিন বলেন, আমাদের কাজী বাড়ির ঐতিহ্যকে আমরা আজো টিকিয়ে রেখেছি। এখন ছন পাওয়া কঠিন। তবুও আমরা মাদারিপুর জেলা থেকে চড়ামূল্যে ছন নিয়ে এসে ছাউনি দেয়ার ব্যবস্থা করি। এখনও দূর-দূরান্তের অনেক মানুষ এই কাচারি ঘর দেখতে আসেন।

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!