হেমন্তের সোনালী রোদে আঁকা এক মিষ্টি বিকাল। নদীর রূপালী বুক চিরে বয়ে চলা মৃদুমন্দ বাতাস, স্রোত আর দুই তীরে মানুষের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস; সব মিলিয়ে যেন রূপসী বাংলার চিরন্তন এক লোকজ উৎসবের ক্যানভাস। ‘হেইয়া হো হেইয়ো’ ধ্বনিতে মধুমতির জলের বুকে অবিরাম ঢেউ তুলে মেতে উঠেছিল ১২টি দ্রুতগামী বাইচের নৌকা। মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা সদরের মধুমতি নদীতে উপজেলা বিএনপি কর্তৃক আয়োজিত প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় নেমেছিল আনন্দ পিয়াসী লাখো আমুদে উৎসুক মানুষের উৎসব। শরৎ-হেমন্তের সন্ধিক্ষণে এই বর্ণিল আয়োজন ঘিরে নদীর দুই তীর জনারণ্যে পরিণত হয়। মহম্মদপুর উপজেলা সদরের কোলঘেঁষে বয়ে যাওয়া মধুমতির দুই পাড়ে জমে ওঠে উৎসুক লাখো মানুষের ভিড়। শিশু-কিশোর ও নারী থেকে শুরু করে প্রবীণ; সবার চোখই ছিল নদীর বুকে।
বেলা ১১টার পর থেকেই দলে দলে আসতে থাকেন মানুষ। মহম্মদপুর ছাড়াও ফরিদপুরের মধুখালী, বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি, নড়াইলের লোহাগড়া, মাগুরা সদর, শালিখা ও শ্রীপুর উপজেলাসহ দূর-দূরান্তের মানুষ বিভিন্ন যানবাহনে এসে সমবেত হওয়ায় নদীপাড় রূপ নেয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। সকলের লক্ষ্য একটাই, ঐতিহ্যের টানে মাতোয়ারা হওয়া। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ও মেলাকে কেন্দ্র করে নদীর দুই পাড়ে সৃষ্টি হয় অভূতপূর্ব উন্মাদনা। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং ঢাকার ‘রূপায়ন গ্রুপ’-এর আর্থিক সহযোগিতায় প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই ‘মধুমতি নৌকাবাইচ মেলা’ ঘিরে পুরো এলাকায় আনন্দঘন ও উৎসবমূখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। রবিবার (পয়লা নভেম্বর) মধুমতি নদীর বুকে গ্রাম-বাংলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা ঘিরে দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন পথ ধরে মধুমতি নদীর তীর অভিমুকে নানান বয়সি ও পেশার মানুষের স্রোত নামে। প্রতিযোগিতায় দূর-দূরান্তের ১২টি বাইচের নৌকা অংশ গ্রহণ করে। এ উপলক্ষ্যে নদীর দুই পাড়ে এক সপ্তাহ আগে থেকেই বসেছে গ্রামীণ মেলা।
নদী তীরবর্তী সহস্রাধিক স্থানে বসে পথ মেলা। এই মেলাকে কেন্দ্র করে মহম্মদপুর সদর, জাঙ্গালীয়া, রায়াপাশা, চরপাচুড়িয়া, রুইজানী, গোপালনগর, ভোলানাথপুর, বসুর ধুলজুড়ী, কাশিপুর, ধোয়াইল, বড়রিয়া ও গোপালপুরসহ অন্তত ৫০টি গ্রামের মানুষের মাঝে বিরাজ করছে বাঁধভাঙা উৎসাহ-উদ্দীপনা। নদী তীরবর্তী প্রতিটি বাড়িতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়-স্বজনের ভিড়ে তৈরি হয়েছে এক আনন্দঘন পারিবারিক মিলনমেলা। নৌকাবাইচ উপভোগ করতে নদীর দুই পাড়ে লাখো মানুষের এই উপচে পড়া ঢল আর প্রাণের উচ্ছ্বাসে পুরো এলাকায় এক উৎসবের রূপ নেয়। মেলা প্রাঙ্গণে বিভিন্ন ধরনের খাবার, মিষ্টি-মিঠাই, রঙিন বেলুন ও খেলনার দোকান এবং বিনোদনের হরেক আয়োজন ঘিরে শিশুদের আনন্দ এবং সারি সারি দোকানপাটে মানুষের জমজমাট উপস্থিতি পুরো পরিবেশকে আরও বেশি প্রাণবন্ত করে তুলেছে। প্রতিযোগিতায় গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, নড়াইল ও মাগুরা জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত ১২টি বাইচের নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।
নানান রঙের নৌকা আর সুসজ্জিত পোশাকে সজ্জিত বাইচারদের ক্ষিপ্রতায় রঙিন হয়ে ওঠে মধুমতির প্রতিটি তরঙ্গ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বেলুন উড়িয়ে মেলার শুভ উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি মন্ত্রী ও মাগুরা-২ আসনের এমপি নিতাই রায় চৌধুরী। বিকাল তিনটা ১৮ মিনিটের সময় ‘কালাই’ ও ‘টালাই’ দুই গ্রুপে আলাদাভাবে শুরু হয় কাঙ্খিত নৌকাবাইচ। বাঁশির সুর আর চড়ন্দারের ঘণ্টার ‘টং টং’ ছন্দে নদীবক্ষে চলে চূড়ান্ত লড়াই। নরম হাতে অভিজ্ঞ মাছির হাল ধরা আর বাইচারদের পেশীবহুল হাতের বৈঠার সুষম টানে নদী যেন খুঁজে পায় নতুন এক স্পন্দন। বৈঠার ছন্দে আর তীরের মানুষের করতালিতে মধুমতি নদী আজ কেবল এক জলাধার ছিল না, হয়ে উঠেছিল আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক। ঐতিহ্য আর আবেগ মিশে শৈশবে ফেরেন প্রবীণরা। উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও মেলা কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ মৈমুর আলী মৃধা বলেন, ‘আধুনিকতার ভিড়ে গ্রামীণ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং মানুষকে নির্মল আনন্দ দেয়াই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য। জাঁকজমকপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে আমরা সেটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি।” মহম্মদপুর থানার (ওসি) এম. শামীম আহম্মেদ জানান, মেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং দর্শনার্থীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত তৎপরতার সাথে কাজ করেছে।
কালের সমাজ/কে.পি

