ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩
নতুন উদ্যোগে স্বস্তির আশা

গ্রামীণ অসচ্ছল পরিবার কম দামে পাবে এলপিজি

কালের সমাজ ডেস্ক | জুলাই ১৭, ২০২৬, ০৪:১১ পিএম গ্রামীণ অসচ্ছল পরিবার কম দামে পাবে এলপিজি
সংগৃহীত ছবি

দেশের প্রান্তিক ও গ্রামীণ এলাকার অসচ্ছল পরিবারের জন্য সুলভমূল্যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নিরাপদ জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, বন উজাড় কমানো এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ হলে শিগগিরই এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হবে।

জানা গেছে, গত ৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সভায় এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ জনগণের জন্য নিরাপদ জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের অনেক গ্রামীণ পরিবার রান্নার কাজে কাঠ, খড়কুটো ও গোবরের ঘুঁটের মতো প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এসব জ্বালানির ধোঁয়া নারী ও শিশুদের শ্বাসযন্ত্রের নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে জ্বালানি কাঠের চাহিদা বনাঞ্চলের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর বাংলাদেশের জ্বালানি খাতবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, ভারতের মতো বাংলাদেশেও ভর্তুকিভিত্তিক এলপিজি কর্মসূচি সফল হতে পারে। তবে শুধু গ্রামীণ দরিদ্র নয়, ঢাকা ও অন্যান্য শহরের বস্তিবাসী নিম্নআয়ের মানুষকেও এ সুবিধার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রকৃত সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করে একটি নির্ভুল ও স্বচ্ছ তথ্যভান্ডার (ডেটাবেজ) তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ভর্তুকিপ্রাপ্ত এলপিজি যাতে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি, পাচার বা অপব্যবহার না হয়, সেজন্য কঠোর নজরদারি ও কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমানে দেশে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বাসাবাড়িতে রান্না, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং অটোগ্যাস হিসেবে এর ব্যবহার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত সাত বছরে দেশে এলপিজির ব্যবহার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১৫ লাখ টনের বেশি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় গৃহস্থালি খাতে। বর্তমানে দেশের মাসিক এলপিজির বাজার প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন।

দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়, আর সরকারি সরবরাহ মাত্র ২ শতাংশ। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাড়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ৮২৫ টাকা হলেও এর সরবরাহ সীমিত।

অন্যদিকে বেসরকারি কোম্পানির সিলিন্ডারের দাম অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দামের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি হয়ে থাকে। যদিও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করে, বাস্তবে খুচরা বাজারে ভোক্তাদের প্রায়ই অতিরিক্ত দাম গুনতে হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ভর্তুকিভিত্তিক এলপিজি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে ভারত এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। সেখানে দরিদ্র পরিবারের জন্য বিনামূল্যে এলপিজি সংযোগ ও রেগুলেটর দেওয়ার পাশাপাশি ভর্তুকির অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগীদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়।

ফলে দুর্নীতি, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য এবং কালোবাজারির সুযোগ অনেকাংশে কমে এসেছে। পাকিস্তানেও শীতপ্রধান ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিম্নআয়ের মানুষের জন্য মৌসুমি ভিত্তিতে কম দামে এলপিজি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশেও সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এই কর্মসূচি শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই বাড়াবে না, বরং গ্রামীণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 
কালের সমাজ/এএইচবি

Link copied!