বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বিনিয়োগে গতি ফিরিয়ে আনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রস্তুত করেছে সরকার।
এটি দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বাজেট। একই সঙ্গে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এত বড় পরিকল্পনার পরও বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড ঘাটতি থাকছে, যা পূরণে সরকারকে ব্যাংক ঋণ, অভ্যন্তরীণ উৎস এবং বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে হবে।
আগের অর্থবছরের তুলনায় বাজেটের আকার বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা, যা শতকরা হিসেবে প্রায় ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বৃদ্ধি। ব্যয়ের পাশাপাশি ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এত বড় পরিকল্পনার পরও বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড ঘাটতি থাকছে, যা পূরণে সরকারকে বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভর করতে হবে। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও প্রবৃদ্ধির নতুন ভিত্তি গড়ে তোলার প্রত্যাশা নিয়েই এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা বাজেট সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বাস্তবায়নসহ ১৩টি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। একই সঙ্গে বাড়ানো হবে উপকারভোগীর সংখ্যাও।
অর্থবিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এটি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। ফলে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে নেওয়া এবং জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, করপোরেট কর হ্রাস, ব্যবসা সহজীকরণ এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ রাখা হচ্ছে।
বাজেটে আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
বাজেটের খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে সমন্বয় করা হবে। তবুও বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার খাতে উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা বাবদ মোট ১ লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাজেটের মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) হিসেবে বাস্তবায়ন করা হবে। এডিপিতে পরিবহন, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে এনবিআরকে প্রধান ভরসা হিসেবে ধরা হয়েছে। এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং করবহির্ভূত উৎস থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতির কারণে এই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাজেটের অন্যতম নতুন দিক হচ্ছে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ ধারণার অন্তর্ভুক্তি। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, সাংস্কৃতিক শিল্প ও উদ্ভাবনভিত্তিক উদ্যোগে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসা সহজ করতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে ‘ডিরেগুলেশন’ নীতির বাস্তবায়নও আলোচনায় রয়েছে।
সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য আটটি প্রধান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৈদেশিক অর্থায়নের ব্যবহার বাড়ানো, ভর্তুকির চাপ সামাল দেওয়া এবং ঋণের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেটটি একদিকে যেমন উচ্চাভিলাষী, অন্যদিকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও বহন করছে। তবে সঠিক নীতি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করা গেলে এই বাজেট দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কালের সমাজ/এএইচবি

