পল্লীকবি জসীম উদ্দীন তাঁর ‘মামার বাড়ি’ কবিতায় লিখেছিলেন-“ঝড়ের দিনে মামার দেশে, আম কুড়াতে সুখ, পাকা জামের মধুর রসে, রঙিন করি মুখ।” জ্যৈষ্ঠের তীব্র রোদ্দুরে আজো গ্রামীণ জনপদে সেই ‘মধুর রস’ আর ‘রঙিন মুখের’ স্মৃতিরা ভিড় করে। তবে সময় বদলেছে।
তথ্য-প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকতার এই চাদরে ঢাকা আধুনিক যুগে মানুষের জীবন এখন বড় বেশি ছকবাঁধা, একঘেয়ে। গ্রামের শিশু-কিশোরদের সেই চিরচেনা ধুলোমাখা দুরন্তপনা এখন চার দেয়ালের ভেতর স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বন্দি। ফলে গ্রাম-বাংলার চিরায়ত ও শাশ্বত এই দৃশ্যগুলো এখন কদাচিৎ নজরে আসে।
মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুরে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা সদরের ধোয়াইল পূর্বপাড়া গ্রামে দেখা মিলল এক খন্ড নিখাদ শৈশবের। এই গ্রামের বাসিন্দা মো. আজাদ মোল্যার ছেলে তৌফিকুজ্জামানের বাড়ির উঠোনের এক বিশাল জাম গাছের মগডালে বসেছিল দুই শিশু-কিশোরের দুরন্তপনা আর উচ্ছ্বাস। গাছে চড়ে, পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা থোকা থোকা কালো জাম পেড়ে খাচ্ছিল জুবায়ের ও রিয়াদুল নামের দুই স্কুল শিক্ষার্থী। এই গ্রামের মো. মনিরুল ইসলামের ছেলে আট বছর বয়সী জুবায়ের মহম্মদপুর আইডিয়াল একাডেমীর দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র এবং অন্যজন লাহুড়িয়া পাড়ার মো. নূর ইসলামের ছেলে ১৫ বছরের রিয়াদুল বসুর ধূলজুড়ী মাধ্যমিক বিদ্যা য়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। দুই ভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীর মগডালে বসে জাম পাড়ার এই দৃশ্য যেন থমকে দিয়েছিল স্থানীয় অনেককেই। ঠিক যেন কবি জসীম উদ্দীনের কবিতার জীবন্ত রূপান্তর।
এক সময় মাগুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় কালো জামের খ্যাতি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। গ্রাম-গঞ্জের গৃহস্থের বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে মেঠো পথ, হাট-বাজার কিংবা সড়ক-মহাসড়কের পাশে ছায়া বিলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত অসংখ্য দেশি জাম গাছ। গ্রীষ্মের শেষে বর্ষার আগমনে যখন ভারী বৃষ্টি নামত, তখন এই পাকা জামগুলো তেলকুচকুচে চকচকে রূপ ধারণ করত। গাছের নিচে জাল পেতে কিংবা ডালে ঝাকুনি দিয়ে জাম সংগ্রহের সেই আনন্দ আজো প্রবীণদের নস্টালজিক করে তোলে। ভরদুপুরে লবণ আর কাঁচা মরিচ দিয়ে জাম কচলিয়ে ভর্তা করে খাওয়ার সেই আসর গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
দুর্ভাগ্যবশত, নগরায়ণ এবং কড়াই বা মেহগনির মতো বাণিজ্যিক কাঠের গাছের ভিড়ে আজ ঐতিহ্যবাহী দেশি জাম গাছ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। কমেছে উৎপাদন, ফলে বাজারেও এর জোগান এখন সীমিত। অথচ চিকিৎসাশাস্ত্রে এই পুষ্টিকর ফলের গুনাগুণ অপরিসীম। হালকা টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফলে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি, জিংক, কপার, গ্লুকোজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবার। এমনকি জামের বীজও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে দারুণ উপকারি ও কার্যকর। এই প্রাকৃতিক ফলের রঙের অনুকরণেই মূলত মিষ্টির জগতে জন্ম নিয়েছে বিখ্যাত ‘কালোজাম’ মিষ্টি।
অন্যান্য মৌসুমি ফলের তুলনায় জামের স্থায়িত্বকাল খুবই কম। সাধারণত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে গাছে ফুল আসে এবং মে-জুন মাসের এই স্বল্প সময়েই তা পেকে শেষ হয়ে যায়। মাত্র এক মাসের এই অতিথি ফলটি কেবল রসনার তৃপ্তিই মেটায় না, বরং নতুন প্রজন্মকে মাটির কাছাকাছি টেনে আনে।
ধোয়াইল পূর্বপাড়া গ্রামের জুবায়ের আর লাহুড়িয়া পাড়া গ্রামের রিয়াদুলদের মতো দুরন্ত শিশু-কিশোর প্রমাণ করে, যত আধুনিকতাই আসুক না কেন, প্রকৃতির অমোঘ টানকে উপড়ে ফেলা অসম্ভব। বিলুপ্তপ্রায় দেশি জাম গাছ রক্ষা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্ক্রিন-নির্ভরতা থেকে বের করে এনে এই মুক্ত প্রকৃতির স্বাদ ফিরিয়ে দেয়া আজ সময়ের দাবি।
কালের সমাজ/কে.পি

