ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

চিরনিদ্রায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ঘোষক তোফায়েল আহমেদ: কোড়ালিয়ায় দাফন সম্পন্ন

বিশেষ প্রতিনিধি | জুন ২, ২০২৬, ০৫:১৯ পিএম চিরনিদ্রায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ঘোষক তোফায়েল আহমেদ: কোড়ালিয়ায় দাফন সম্পন্ন

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই। আজ মঙ্গলবার (২ জুন) বেলা সোয়া ৪টায় তাঁর জন্মভূমি ভোলার সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে বাবা-মা ও স্ত্রীর কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে। 

ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায়ের মধ্য দিয়ে অবসান হলো বাংলাদেশের রাজনীতির একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের।

এর আগে, বেলা আড়াইটায় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢল নামে জনতার।

দ্বীপ জেলা থেকে জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম এই অগ্রনায়ক ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মৌলভী আজহার আলী ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মা ফাতেমা খানম ছিলেন গৃহিণী।

শিক্ষা জীবনে তিনি ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে যথাক্রমে ১৯৬২ ও ১৯৬৪ সালে আইএসসি ও বিএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি মফিজুল হক তালুকদারের বড় মেয়ে আনোয়ার বেগমকে বিয়ে করেন। তিনি এক কন্যাসন্তানের জনক।

ছাত্ররাজনীতির সোনালী দিন ও ‍‍`বঙ্গবন্ধু‍‍` উপাধি

কলেজ জীবন থেকেই তোফায়েল আহমেদ ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন। ব্রজমোহন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ডাকসুর (DUCSU) ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই সময়েই তিনি চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফাকে ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দী শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দির মুক্তির পর, ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো জনতার সামনে বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তরুণ নেতা তোফায়েল আহমেদ।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠন

১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর, ১৯৭০ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভোলার আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার অধিনায়কের একজন। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা অঞ্চল নিয়ে গঠিত মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান কমান্ড ছিল তাঁর হাতে। দেশ স্বাধীনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিজের রাজনৈতিক সচিব এবং ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী নিযুক্ত করেন।

জেল-জুলুম ও সংসদীয় রাজনীতির কিংবদন্তি

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তোফায়েল আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি দীর্ঘ ৩৩ মাস কারাবরণ করেন। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ১৯৭৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে মোট ১২টি সংসদীয় নির্বাচনের মধ্যে ৯টিতেই বিজয়ী হয়ে সংসদে ভোলার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬: টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি সফলভাবে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ ও ২০১৪: আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০১৪ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

২০১৮ ও ২০২৪: সর্বশেষ শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন তিনি।

২০২১ সাল থেকে অসুস্থতার কারণে তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলেও, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর এই চলে যাওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল।

 

কালের সমাজ/কে.পি

 

Link copied!