টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড় ধসের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় ভয়াবহ দুর্যোগের সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা ও পাহাড় ধসে এখন পর্যন্ত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। দুর্যোগে প্লাবিত হয়েছে ৫৮টি উপজেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন ও ১১টি পৌরসভা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবারের সদস্যরা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের শনিবার ( ১১ জুই) ন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ এই সাত জেলা বর্তমানে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এবারের দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে। সেখানে বন্যা ও পাহাড় ধসে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও ২৪ জন। পাহাড়ি এলাকায় টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধস এবং নিচু এলাকায় আকস্মিক পানি প্রবেশের ফলে হতাহতের এ ঘটনা ঘটে।

চট্টগ্রামেও পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিভাগীয় শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও দেয়াল ধসের ঘটনায় ১১ জনের প্রাণহানি হয়েছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১২ জন। শহরের বিভিন্ন সড়ক, আবাসিক এলাকা এবং গ্রামীণ জনপদে পানি জমে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক স্থানে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। পার্বত্য জেলা বান্দরবানে পাহাড় ধস ও ঢলের পানিতে ভেসে মারা গেছেন ৬ জন। আহত হয়েছেন আরও দুজন। রাঙামাটিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ জন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজারে বন্যার পানিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও হবিগঞ্জ ও খাগড়াছড়িতে প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবে সেখানে বন্যার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন চট্টগ্রাম জেলায়। জেলার ১৬টি উপজেলায় আংশিক ও পূর্ণ জলাবদ্ধতায় প্রায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩০ জন মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। পানিবন্দি হয়ে আছেন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবারের সদস্যরা। অনেক এলাকায় বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি ও স্থানীয় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলার তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কক্সবাজার। জেলার ১০টি উপজেলার ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন মানুষ বন্যার কবলে পড়েছেন। পানিবন্দি হয়েছেন ৩৯ হাজার ৫০৬টি পরিবার। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হলেও অনেক পরিবার এখনও নিজ বাড়িতে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এদিকে খাগড়াছড়ির ৯টি উপজেলায় ২৭ হাজার ২২০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। রাঙামাটির ৯টি উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩ হাজার ৫২৪ জন। বান্দরবানের ৭টি উপজেলায় ৮ হাজার ৩৫০ জন, মৌলভীবাজারের ৪টি উপজেলায় ৩৮ হাজার ১৭২ জন এবং হবিগঞ্জের ৩টি উপজেলায় ২৮ হাজার ১৪০ জন মানুষ বন্যার কারণে নানা ধরনের দুর্ভোগে পড়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নিরাপদ আশ্রয়ে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তবে অনেক এলাকায় এখনও যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। সড়ক তলিয়ে যাওয়া, সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি অব্যাহত থাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমেও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্যার পানি ধীরে ধীরে কিছু এলাকায় কমতে শুরু করলেও অনেক নিম্নাঞ্চল এখনও জলাবদ্ধ রয়েছে। আবহাওয়ার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে বন্যা পরিস্থিতির পরবর্তী অবস্থা। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন মানবিক সংগঠনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ চললেও দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ এখনও কাটেনি। দ্রুত পানি নেমে যাওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর সংস্কার এবং পর্যাপ্ত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কালের সমাজ/এ এইচ বি

