কাকডাকা ভোর। চারপাশ তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। হঠাৎ গাছের মগডাল থেকে ভেসে আসে হাজারো বাদুড়ের কিচিরমিচির শব্দ। ডানা ঝাপটানোর শব্দে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। গাছের ডালে ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা অসংখ্য বাদুড়ের দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় হারিয়ে যেতে বসা গ্রাম-বাংলার সেই অতীত।
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের একটি বাগানে এখন এমনই ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা গেছে। স্থানীয় মো. বদিউর রহমানের ব্যক্তিগত বাগানের প্রায় ২০টি মেহগনি, লম্বু ও শিশু গাছে গত দুই মাস ধরে আশ্রয় নিয়েছে আনুমানিক ১০ থেকে ১২ হাজার বাদুড়। দিনের আলোয় গাছের মগডালে দল বেঁধে ঝুলে থাকে তারা। আর সন্ধ্যা নামলেই খাবারের সন্ধানে উড়ে যায় দূর-দূরান্তে। জায়গাটি এখন যেন বাদুড়ের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
এক সময় গ্রাম-বাংলার উঁচু গাছ, পুরোনো বাড়ির আঙিনা কিংবা ঝোপঝাড়ে বাদুড়ের দেখা মিলত হরহামেশাই। কিন্তু গাছপালা কমে যাওয়া, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস ও শিকারিদের উপদ্রবে ক্রমেই কমেছে তাদের সংখ্যা। সেই বাস্তবতার মধ্যে গোপীনাথপুরের এই বাগানে হাজার হাজার বাদুড়ের এমন নিরাপদ আশ্রয় স্থানীয়দের মধ্যেও তৈরি করেছে কৌতূহল।
ভোর হতেই শুরু হয় তাদের ব্যস্ততা। কেউ ডানা ঝাপটাচ্ছে, কেউ গাছের এক ডাল থেকে আরেক ডালে যাচ্ছে, আবার কেউবা উড়ে গিয়ে ফিরে এসে সঙ্গীদের সঙ্গে জড়ো হচ্ছে। এই দৃশ্য দেখতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ আসছেন। স্থানীয়রা কেউ বাদুড়গুলোকে বিরক্ত করছেন না। ফলে নির্বিঘ্নেনই সেখানে দিন কাটছে তাদের।
স্থানীয় রকিবুল ইসলাম বলেন, “ছোটবেলায় বাড়ির আঙিনার বড় বড় গাছে বাদুড় ঝুলে থাকতে দেখতাম। বহু বছর ধরে তেমন দেখা যায় না। মাস দুয়েক আগে বাড়ির পাশের এই বাগানে এত বাদুড় দেখে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেছে। গ্রামের মানুষও তাদের বিরক্ত করছে না।”
ওহিদ মোল্যা বলেন, “এখানে ১০ থেকে ১২ হাজার বাদুড় আছে বলে মনে হয়। সারাদিন গাছগুলোতে ঝুলে থাকে, আবার কখনো দুরন্তপনা করে। সন্ধ্যার পর খাবারের সন্ধানে বের হয়। তবে সব বাদুড় একসঙ্গে বের হয় না, দল বেঁধে ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়।”
বাগান মালিক মো. বদিউর রহমান বলেন, “অনেক আগে বাদুড় দেখেছি। এখন তো বাদুড়ের দেখা মেলাই কঠিন। কিন্তু গত দুই মাস ধরে আমার বাগানে হাজার হাজার বাদুড় থাকছে। এত বাদুড় একসঙ্গে কোনোদিন দেখিনি।”
বাদুড়কে ঘিরে স্থানীয়দের এই আগ্রহের পেছনে শুধু কৌতূহল নয়, রয়েছে পরিবেশগত গুরুত্বও। বাদুড় প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি নিশাচর ও স্তন্যপায়ী প্রাণী। বিভিন্ন প্রজাতির বাদুড় পোকামাকড় খেয়ে কৃষিতে সহায়তা করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
মহম্মদপুর উপজেলা কৃষি অফিসার ইশরাত জাহান শিলু বলেন, “বাদুড় পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তারা ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উপকার করে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায়ও বাদুড়ের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।”
প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে উপজেলার গোপীনাথপুরের এই বাগানে বাদুড়ের এই আশ্রয় হয়তো সাময়িক। তবে হাজারো বাদুড়ের একসঙ্গে নিরাপদে বসবাসের এমন দৃশ্য গ্রাম-বাংলায় ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। তাই এই অভয়ারণ্যকে টিকিয়ে রাখতে স্থানীয়দের সচেতনতা এবং প্রাণীগুলোর নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন পরিবেশসচেতন ব্যক্তিরা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সুব্রত সেন বিশ্বাস বলেন, “বাদুড় মূলত প্রকৃতিবান্ধব স্তন্যপায়ী প্রাণী। তারা পোকামাকড় খেয়ে ফসলের ক্ষেত রক্ষা করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে অবদান রাখে।”
কালের সমাজ/কে.পি

