ঢাকা সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩

ডিজিটাল যুগেও টিকে আছে লাল মলাটের হালখাতা

হাসনাত হান্নান তামিম, মহম্মদপুর (মাগুরা) | মে ১১, ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম ডিজিটাল যুগেও টিকে আছে লাল মলাটের হালখাতা

আধুনিক ডিজিটাল লেনদেনের যুগেও বৈশাখ এলে লাল মলাটের সেই পুরোনো খাতার আবেদন আজও ফিকে হয়ে যায়নি। ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সম্পর্ককে নতুন করে গড়ে তোলার এক অনন্য উপলক্ষ হিসেবেই টিকে আছে হালখাতা।

ইতিহাসবিদদের মতে, মোগল স¤্রাট আকবরের আমল থেকেই হালখাতার প্রচলন শুরু হয়। আকবর ‘ফসলি সন’ বা বঙ্গাব্দ চালুর পর খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে চৈত্র সংক্রান্তির পর নতুন খাতা খোলার নিয়ম চালু করেন। বকেয়া খাজনা পরিশোধের পর কৃষকদের মিষ্টিমুখ করানোর রীতিই পরবর্তীতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং সময়ের পরিক্রমায় তা রূপ নেয় বাঙালির এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে।

এক সময় হিন্দু ব্যবসায়ীরা নতুন খাতার ওপরে ‘শ্রী’ বা গণেশের ছবি আঁকতেন, আর মুসলিম ব্যবসায়ীরা লিখতেন ‘এলাহি ভরসা’। ভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে হালখাতা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে এক অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক।

হালখাতার মূল আকর্ষণ সেই লাল মলাটের ‘খেরো খাতা’। বছরজুড়ে বাকিতে কেনাকাটার হিসাব চুকিয়ে বৈশাখে নতুন করে লেনদেন শুরু করতেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। পাওনা পরিশোধের পর ক্রেতাদের মিষ্টি, লুচি কিংবা বিশেষ আপ্যায়নের মাধ্যমে স্বাগত জানানো হতো। এতে শুধু হিসাবের খাতা নয়, সম্পর্কের বন্ধনও নবায়ন হতো।

ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার কিংবা পুরান ঢাকার বড় বড় আড়তগুলোতে এখনও হালখাতার জাঁকজমক দেখা যায়। ব্যবসায়ীদের ভাষায়, এটি তিক্ততা ভুলে নতুনভাবে সম্পর্ক শুরুর দিন। বছরের নানা সময় দেনা-পাওনা নিয়ে মনোমালিন্য থাকলেও বৈশাখের এই আয়োজন সবাইকে আবারও একত্র করে।

তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু। কাগজের খাতার জায়গা দখল করছে কম্পিউটার, মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল হিসাব ব্যবস্থা। অনলাইন ব্যাংকিং ও কার্ড পেমেন্টের কারণে আগের মতো দোকানে গিয়ে হিসাব মেলানোর প্রবণতা কমেছে। তারপরও  গ্রামগঞ্জ ও মফস্বলে হালখাতার ঐতিহ্য এখনও টিকে আছে নিজস্ব আবহে।

মাগুরার মহম্মদপুর সদর বাজারের বাংলাদেশ জুয়েলার্সের মালিক রাজকুমার আদিত্য চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। ১৫ বছর বয়স থেকে স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এই ব্যবসায়ী এখনো বৈশাখ এলেই আয়োজন করেন হালখাতার। এবার বৈশাখের শেষের দিকে তিনি এই আয়োজন করেছেন।

তিনি বলেন, “২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে হালখাতা করছি। শুরু থেকেই লুচি ও মিষ্টির আয়োজন রাখি। আগে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ দেনাদার এসে বকেয়া পরিশোধ করতেন। এখন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ আসেন। পাওনা আদায় দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। তারপরও পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছি।”

বর্তমানে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সারা বছরই বিভিন্ন সময় হালখাতা আয়োজন করা হলেও বৈশাখের সঙ্গে এর সম্পর্ক আজও অবিচ্ছেদ্য। মিষ্টির প্যাকেট হাতে বাড়ি ফেরার স্মৃতি এখনও অনেক প্রবীণ মানুষকে ফিরিয়ে নেয় নস্টালজিয়ার দিনে।

যান্ত্রিক এই সময়ে হালখাতা মনে করিয়ে দেয়, বাণিজ্য শুধু লেনদেন নয়, এটি সম্পর্ক, বিশ্বাস ও সম্প্রীতিরও প্রতীক। করপোরেট সংস্কৃতি আর ডিজিটাল ব্যবস্থার ভিড়েও তাই লাল মলাটের সেই খাতা বাঙালির ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল-দস্তাবেজ হয়েই রয়ে গেছে।

কালের সমাজ/এসআর

Link copied!