ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

শিক্ষার আলো ছড়ান, ধর্মচর্চায় নিবেদিত- শেকড়ের টানে মৃৎশিল্পী বিকাশ কুমার পাল

মুকসুদপুর প্রতিনিধি, গোপালগঞ্জ | অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ০৮:৩৮ পিএম শিক্ষার আলো ছড়ান, ধর্মচর্চায় নিবেদিত- শেকড়ের টানে মৃৎশিল্পী বিকাশ কুমার পাল

মানুষের জীবনে সাফল্যের সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেক রকম। কেউ সাফল্য খোঁজেন উচ্চশিক্ষায়, কেউ পেশাগত প্রতিষ্ঠায়, আবার কেউ নিজের ঐতিহ্য ও শেকড়কে আঁকড়ে ধরে খুঁজে পান আত্মতৃপ্তি। তবে একজন মানুষের জীবনে যখন শিক্ষা, মানবসেবা, ধর্মচর্চা ও পৈতৃক পেশার প্রতি ভালোবাসা একসূত্রে মিলে যায়, তখন তাঁর জীবন হয়ে ওঠে অনুকরণীয়। এমনই এক ব্যতিক্রমী মানুষ বিকাশ কুমার পাল।

পেশায় তিনি শেখ আব্দুর রাজ্জাক আলিম মাদ্রাসার সহকারী ইংরেজি শিক্ষক। পাশাপাশি কৃষ্ণাদিয়া বাজারে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে অসহায় ও চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। শাস্ত্রীয় বিদ্যায় "কাব্যতীর্থ" অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায়ও নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। সনাতন ধর্মের নানা কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের পাশাপাশি নিজ বাড়িতে গড়ে তুলেছেন বইসমৃদ্ধ একটি পাঠশালা, যেখানে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরির প্রয়াস রয়েছে।

এতোসব পরিচয় ও কর্মব্যস্ততার মাঝেও বিকাশ কুমার পাল কখনো কোনো কাজকে ছোট করে দেখেন না। তাঁর কাছে কাজের মর্যাদা নির্ভর করে না পেশার আভিজাত্যে; বরং কাজের প্রতি নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও ভালোবাসাই তাঁর কাছে বড়।

আর্থিক অনটন পেরিয়ে শিক্ষার পথে
পৈতৃক সূত্রে পাল বংশে জন্ম নেওয়া বিকাশ কুমারের শিক্ষাজীবন মোটেও মসৃণ ছিল না। আর্থিক অনটন ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু শত বাধা-বিপত্তিও তাঁর শিক্ষার পথ রুদ্ধ করতে পারেনি। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি একের পর এক শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করেছেন।

তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা ৭ নম্বর বাহিরবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৯১ সালে সেখান থেকে পঞ্চম শ্রেণি সম্পন্ন করেন। ১৯৯৬ সালে কৃষ্ণাদিয়া বাগুমৃধা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর নবকাম পল্লী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এইচএসসি, সরকারি মুকসুদপুর কলেজ থেকে বিএ এবং রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে শান্তা মারিয়াম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএড ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছোটবেলা থেকেই তাঁর হাতের লেখা ছিল দৃষ্টিনন্দন ও মনোমুগ্ধকর। পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং শেখার প্রতি গভীর আগ্রহই তাঁকে জীবনের প্রতিটি ধাপে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।
শিক্ষকের পরিচয়ের বাইরেও মানবসেবার প্রয়াস
শিক্ষকতা শুধু তাঁর জীবিকা নয়, মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যমও। শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি পড়ানোর পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি সমাজের মানুষের উপকারে আসতে চান। বিশেষ করে অসহায় ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত মানুষের পাশে থাকার যে প্রয়াস, তা তাঁর বহুমুখী জীবনচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

অন্যদিকে ধর্মীয় শাস্ত্রচর্চা ও সনাতন ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। নিজ বাড়িতে বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে পাঠশালা গড়ে তোলার উদ্যোগ তাঁর জ্ঞানপ্রীতির আরেকটি পরিচয় বহন করে।

শেকড়ের টানে ফিরে আসেন পৈতৃক পেশায়
বিকাশ কুমার পালের জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হয়তো এখানেই। শিক্ষাগত যোগ্যতা, শিক্ষকতার মতো সম্মানজনক পেশা এবং নানা সামাজিক-ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকার পরও তিনি ভুলে যাননি নিজের বংশপরম্পরায় চলে আসা পৈতৃক পেশা, মৃৎশিল্পকে।
এবারের দূর্গাপূজার সময়ে টেংরাখোলা পোস্ট অফিস সড়কের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখা যায় মৃৎশিল্পের বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করতে।

মাটির তৈরি সৌখিন সামগ্রী নিয়ে বসে থাকা এই মানুষটির পরিচয় কেবল একজন বিক্রেতার নয়; তিনি এমন এক ঐতিহ্যের ধারক, যে ঐতিহ্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলার লোকজ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।

যে মানুষটি একদিকে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন, অন্যদিকে জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সময় দেন, তিনিই আবার অবলীলায় ফিরে যান মাটির শিল্পের কাছে। তাঁর কাছে পৈতৃক পেশা কোনো সংকোচের বিষয় নয়; বরং শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ, বংশের ঐতিহ্য এবং শ্রমের মর্যাদা রক্ষার এক অনন্য প্রকাশ।

কাজের মর্যাদা তাঁর জীবনের শিক্ষা
সমাজে অনেক সময় মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করা হয় তাঁর পদবি, ডিগ্রি কিংবা পেশার ভিত্তিতে। কিন্তু বিকাশ কুমার পাল যেন নীরবে সেই ধারণার বাইরে দাঁড়িয়ে অন্য এক বার্তা দেন, শিক্ষিত হওয়া মানে নিজের শেকড়কে ভুলে যাওয়া নয়, আর সম্মানজনক পেশায় যুক্ত থাকা মানে অন্য কোনো কাজকে ছোট করে দেখা নয়।
তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা শুধু অর্জিত সনদে নয়; বরং তাঁর মনন, কর্ম, মানবিকতা এবং নিজের ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতায়।

শিক্ষকতা, জ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, মানবসেবার প্রয়াস এবং মৃৎশিল্পের সঙ্গে আত্মিক বন্ধন মিলিয়ে বিকাশ কুমার পাল এক ব্যতিক্রমী জীবনচিত্রের নাম। তাঁর এই পথচলা যেন বলে যায়, মানুষ যতো উচ্চতায় উঠুক, নিজের শেকড়কে ভালোবাসার মধ্যে কোনো ছোটত্ব নেই; বরং সেখানেই লুকিয়ে থাকে জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য।

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!