বিডিআর বিদ্রোহের পর চাকরি হারিয়ে নতুন জীবনের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। সেখানে কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তুলেছিলেন ব্যবসা, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিজ এলাকায় একটি কওমি মাদ্রাসা। স্বপ্ন ছিল পরিবারকে স্বাবলম্বী করা এবং দ্বীনি শিক্ষার প্রসার ঘটানো। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। সৌদি আরবের আবহা শহরে দুই সুদানি নাগরিকের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারালেন কুমিল্লার দেবীদ্বারের প্রবাসী ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম। অবশেষে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে দেশে ফিরেছে তাঁর মরদেহ। শনিবার (৭ নভেম্বর) সকালে নিজ গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।
নিহত খোরশেদ আলম (পরিবারের দেওয়া তথ্যমতে) কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের ভিরাল্লা গ্রামের হাজী আনছর আলীর বাড়ির মৃত হাজী নুরুল ইসলামের ছেলে। গত ১১ অক্টোবর সৌদি আরবের আবহা শহরে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সুদানি নাগরিকদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন তিনি।
শনিবার সকাল ১০টায় ভিরাল্লা গ্রামে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা অংশ নেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে শুক্রবার দুপুরে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁর মরদেহবাহী কফিন বাংলাদেশে পৌঁছায়। মরদেহ গ্রামে আসার পর স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
পরিবার ও স্বজনদের ভাষ্য, ২০০৯ সালে ঢাকার পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় চাকরিচ্যুত হন খোরশেদ আলম। ওই সময় তিনি খাগড়াছড়িতে কর্মরত ছিলেন। চাকরি হারানোর পর তাঁকে দুই বছরেরও বেশি সময় কারাবরণ করতে হয়। জীবিকার অনিশ্চয়তা ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংকটে পড়ে ২০১৭ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি।
প্রবাসে শুরুতে একটি মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজ করেন খোরশেদ। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও সঞ্চয় দিয়ে পরে একটি লন্ড্রির দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যবসার আয় থেকে নিজ এলাকায় একটি কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মাদ্রাসার শিক্ষা উপকরণসহ বিভিন্ন ব্যয় নিজেই বহন করতেন বলে জানান স্বজনরা। তাঁর স্বপ্ন ছিল এলাকায় দ্বীনি শিক্ষার বিস্তার ঘটানো।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, গত ১১ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টার দিকে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বকেয়া টাকা আদায় নিয়ে এক বাংলাদেশি কর্মচারীর সঙ্গে সুদানের দুই নাগরিকের বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তাঁরা ওই কর্মচারীকে মারধর করেন। খবর পেয়ে খোরশেদ বাসা থেকে দোকানে এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
এ সময় সুদানি নাগরিকরা তাঁর বুকে ছুরিকাঘাত করেন বলে পরিবারের অভিযোগ। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সৌদি পুলিশ অভিযুক্ত দুই সুদানি নাগরিককে আটক করে। তাঁদের বিরুদ্ধে সেখানে বিচারপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার। অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও দ্রুত বিচার প্রত্যাশা করছেন স্বজনরা।
খোরশেদ আলমের কোনো ছেলে সন্তান নেই। তাঁর চার মেয়ে। বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে শোক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তাঁরা।
নিহতের বড় মেয়ের জামাতা নাজমুল হাসান বলেন, “আমার শ্বশুরের কোনো ছেলে সন্তান নেই। আমার স্ত্রীসহ তাঁরা চার বোন। এখন তাঁরা পিতৃহারা হয়ে নিঃস্ব। তিনি বিনা দোষে বিডিআর বিদ্রোহের কারণে চাকরি হারিয়েছিলেন। সরকার তাঁকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা করেনি। আমরা চাই, তাঁর চাকরির পেনশনের টাকা দিয়ে সরকার আমাদের সহযোগিতা করুক।”
খোরশেদ আলমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, “খোরশেদ আলমের মৃত্যুর খবর আমরা জেনেছি। মরদেহ দেশে আসা থেকে শুরু করে দাফন পর্যন্ত খোঁজখবর রেখেছি।”
বিডিআর বিদ্রোহের ধাক্কায় জীবনের গতিপথ বদলে যাওয়া খোরশেদ আলমের এমন মর্মান্তিক পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না পরিবার ও এলাকাবাসী। চাকরি হারানোর পর প্রবাসে নতুন করে জীবন গড়ার সংগ্রাম, নিজের উপার্জনে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন—সবকিছুই থেমে গেল এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে। দেবীদ্বারের ভিরাল্লা গ্রামের মানুষের কাছে খোরশেদ আলমের জীবন ও মৃত্যু এখন এক বেদনাবিধুর স্মৃতি।
কালের সমাজ/কে.পি

