ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩

কান ছাড়া জন্ম বাংলাদেশি শিশুর শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে আনতে বোন কন্ডাকশন ইমপ্লান্ট

কালের সমাজ ডেস্ক | জুলাই ৭, ২০২৬, ১২:১২ পিএম কান ছাড়া জন্ম বাংলাদেশি শিশুর শ্রবণশক্তি  ফিরিয়ে আনতে বোন কন্ডাকশন ইমপ্লান্ট
প্রতীকী

জন্মগতভাবে বাইরের কান (পিনা), কাননালী এবং কানের পর্দা ছাড়াই জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের সাত বছর বয়সী এক শিশুর জীবনে নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান। দীর্ঘদিন সম্পূর্ণ শ্রবণপ্রতিবন্ধী হিসেবে বেড়ে ওঠা এই শিশুর শরীরে সম্প্রতি সফলভাবে বোন কন্ডাকশন ইমপ্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে।

ভারতের কলকাতার সিএমআরআই সিকে বিড়লা হাসপাতালে পরিচালিত এই বিশেষায়িত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসকরা আশা করছেন, খুব শিগগিরই শিশুটি প্রথমবারের মতো বাইরের পৃথিবীর শব্দ শুনতে সক্ষম হবে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটির অন্তঃকর্ণ (ককলিয়া) স্বাভাবিকভাবে কাজ করলেও জন্মগত ত্রুটির কারণে তার বাইরের কান, কাননালী এবং কানের পর্দা গঠিত হয়নি। ফলে বাইরের শব্দ স্বাভাবিক পথে অন্তঃকর্ণ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছিল না এবং সে সম্পূর্ণ বধির অবস্থায় ছিল। এই শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় চিকিৎসকরা প্রচলিত ককলিয়ার ইমপ্লান্টের পরিবর্তে বোন কন্ডাকশন ইমপ্লান্ট পদ্ধতি বেছে নেন।

অস্ত্রোপচারের নেতৃত্বদানকারী অটোলজিস্ট ককলিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জন ডা. এনভিকে মোহন জানান, এই প্রযুক্তিতে ত্বকের নিচে একটি চৌম্বকীয় ইমপ্লান্ট স্থাপন করা হয়, যা মাথার খুলির হাড়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। অস্ত্রোপচারের ক্ষত সম্পূর্ণ সেরে ওঠার পর তিন সপ্তাহ পরে এর সঙ্গে একটি বাহ্যিক সাউন্ড প্রসেসর সংযুক্ত করা হবে।

এই প্রসেসরে থাকা মাইক্রোফোন আশপাশের শব্দ সংগ্রহ করবে এবং তা কম্পন বা ডিজিটাল সংকেতের মাধ্যমে সরাসরি অন্তঃকর্ণে পৌঁছে দেবে। ফলে কাননালী কিংবা কানের পর্দার প্রয়োজন ছাড়াই শিশুটি শব্দ অনুভব করতে পারবে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ধরনের ইমপ্লান্টকে পাইজোইলেকট্রিক বোন কন্ডাকশন ইমপ্লান্ট বলা হয়। এর অভ্যন্তরীণ অংশটি একটি ছোট টাইটানিয়ামের কাঠামো, যা কানের পেছনের মাথার খুলির হাড়ে স্থাপন করা হয়। টাইটানিয়াম ধীরে ধীরে হাড়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে একীভূত হয়ে যায়।

পরবর্তীতে একটি চৌম্বকীয় সংযোগের মাধ্যমে বাহ্যিক সাউন্ড প্রসেসরটি এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই প্রসেসর সহজেই খুলে রাখা যায়, তাই গোসল, সাঁতার বা ঘুমানোর সময় এটি খুলে রাখা সম্ভব।

ডা. মোহনের মতে, শিশুটির কানের বিকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কাননালী পুনর্গঠন করতে গেলে একাধিক জটিল অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতো এবং তাতেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না।

তাই ঝুঁকিপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে এমন একটি প্রযুক্তি বেছে নেওয়া হয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে কম জটিল এবং কার্যকরভাবে শ্রবণক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে সক্ষম।

তিনি আরও জানান, চিকিৎসার বর্তমান পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুটির শ্রবণশক্তি পুনরুদ্ধার করা। একবার বাহ্যিক প্রসেসরটি সংযুক্ত হয়ে কার্যকরভাবে কাজ শুরু করলে সে বাইরের কান না থাকলেও স্বাভাবিকভাবে শব্দ শুনতে পারবে।

পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে কৃত্রিম বাইরের কান (পিনা) তৈরি করা বা প্রস্থেটিক কান ব্যবহার করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

বোন কন্ডাকশন ইমপ্লান্ট এবং ককলিয়ার ইমপ্লান্টের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যও উল্লেখযোগ্য। ককলিয়ার ইমপ্লান্ট মূলত সেইসব রোগীর জন্য ব্যবহৃত হয়, যাদের অন্তঃকর্ণ বা শ্রবণ স্নায়ুর কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

এটি ক্ষতিগ্রস্ত অংশকে বাইপাস করে সরাসরি শ্রবণ স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে। অন্যদিকে বোন কন্ডাকশন ইমপ্লান্ট এমন রোগীদের জন্য উপযোগী, যাদের অন্তঃকর্ণ স্বাভাবিক থাকলেও বাইরের বা মধ্যকর্ণের গঠনগত ত্রুটির কারণে শব্দ সেখানে পৌঁছাতে পারে না। এই প্রযুক্তিতে মাথার খুলির হাড়ের কম্পনের মাধ্যমে শব্দ সরাসরি ককলিয়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়।

সফল অস্ত্রোপচারের পর শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ে ক্ষত সম্পূর্ণ সেরে উঠলে বাহ্যিক সাউন্ড প্রসেসরটি সংযুক্ত করা হবে।

এরপর ধাপে ধাপে অডিওলজিক্যাল প্রোগ্রামিং এবং শ্রবণ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাকে নতুনভাবে শব্দের জগতে অভ্যস্ত করে তোলা হবে। চিকিৎসকদের আশা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই চিকিৎসা শিশুটির জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি তার ভাষা, শিক্ষা সামাজিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কালের সমাজ/এএইচবি

স্বাস্থ্য বিভাগের আরো খবর

Link copied!