গত বছরের শেষের দিক থেকেই দেশে ঊর্ধ্বমুখী ছিল সার্বিক মূল্যস্ফীতি। তবে কয়েক মাস ধরে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে মূল্যস্ফীতির সেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। টানা তৃতীয় মাসে কমে আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।
একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমে ৭ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মূল্যচাপ কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, গত জুলাইয়ে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে তা শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। এর আগে জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং মে মাসে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। সে হিসাবে মে মাসের তুলনায় তিন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে ১ দশমিক ১৬ শতাংশ।
বিবিএসের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয় ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে তা আরও বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে পৌঁছায়। মার্চে কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ হলেও এপ্রিলে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। মে মাসে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে ওঠে।
বিবিএসের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, জুন থেকে মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করে। ওই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। জুলাইয়ে তা কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং সর্বশেষ আগস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে আসে। ফলে মে মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর টানা তিন মাসে মূল্যস্ফীতি কমেছে।
মূল্যস্ফীতি কমার ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার গতি কমে আসাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিবিএসের হিসাবে, আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে, যা জুলাইয়ে ছিল ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছরের আগস্টের তুলনায়ও চলতি বছরের আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে।
গ্রাম ও শহর—উভয় এলাকাতেই মূল্যস্ফীতি কমেছে বলেও বিবিএস জানিয়েছে। সংস্থাটির পরিসংখ্যান বলছে, আগস্টে গ্রামীণ এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩১ শতাংশে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে মূল্যস্ফীতি জুলাইয়ের ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে কমে আগস্টে হয়েছে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ।
বাজারে পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগও মূল্যচাপ কমাতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানো এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির (ওএমএস) কার্যক্রম সম্প্রসারণ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল রাখতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্যক্রমও জোরদার করা হচ্ছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তুলনামূলক কম দামে আমদানি করা কিছু নিত্যপণ্য ভর্তুকি ছাড়াই বাজারে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে মূল্যস্ফীতির নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকার চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে আসা সেই লক্ষ্যের দিকে অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়ার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কমেছে। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ পুরোপুরি কমেছে, এমনটি বলা যাচ্ছে না।
কালের সমাজ/কে.পি

