গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাকের নিয়োগ ও চাকরি-সংক্রান্ত ইতিহাস এবং টেন্ডার বাণিজ্যের তদন্তের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নাশিদ আহমেদ তুষার নামে এক সচেতন নাগরিক। বুধবার (৭ অক্টোবর ২০২৬) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ডাক গ্রহণ ও বিতরণ শাখায় অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রের রিসিভড কপি থেকে দেখা গেছে।
অভিযোগপত্রে সুদীপ বসাককে বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদ চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে উপসহকারী প্রকৌশলী পদে যোগদান, পরবর্তী সময়ে চাকরি নিয়মিতকরণ এবং দ্রুত পদোন্নতির অভিযোগ তুলে এসব বিষয়ে সরকারি নথি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ২০০৯ সালের ২৬ নভেম্বর যথাযথ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই সুদীপ বসাককে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের যান্ত্রিক শাখায় উপসহকারী প্রকৌশলী পদে বসানো হয় এবং তিনি সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করতে থাকেন। অভিযোগকারী এ নিয়োগ ও পরবর্তী চাকরি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বৈধতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
তবে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে সুদীপ বসাকের চাকরির ইতিহাস সম্পর্কে আরও নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। যুগান্তর ও কালের সমাজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৬ সালের ৯ জুলাই তিনি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই দৈনিক চুক্তির ভিত্তিতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের যান্ত্রিক শাখায় উপসহকারী প্রকৌশলী পদে যোগ দেন। প্রায় তিন বছর পর ২০০৯ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁরসহ আরও পাঁচ উপসহকারী প্রকৌশলীর চাকরি নিয়মিত করা হয়।
অর্থাৎ অভিযোগপত্রে ২০০৯ সালের ২৬ নভেম্বরের যে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, সেটি এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনে বর্ণিত ২০০৬ সালের প্রাথমিক যোগদান ও ২০০৯ সালের চাকরি নিয়মিতকরণের তথ্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ফলে নিয়োগপত্র, নিয়োগবিধি, নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণী, চাকরি নিয়মিতকরণের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন যাচাই ছাড়া বিষয়টির চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা যায় না।
সুদীপ বসাকের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি নতুন নয়। ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের গণশুনানিতে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ওঠে বলে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুটি ওয়েব্রিজের কাজ করানোর অভিযোগও ছিল। সুদীপ বসাক তখন অভিযোগটি অস্বীকার করে কাজটি নিয়ম মেনেই হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। পরে দুদক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাছে সংশ্লিষ্ট নথি চেয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
২০২০ সালে তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধানের কথাও প্রকাশিত প্রতিবেদনে আসে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দরপত্র ও ক্রয়সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি চাওয়া হয়েছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এরপর ২০২২ সালের মার্চে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন তাঁর বিরুদ্ধে প্ল্যান্ট, রোলার ও মরদেহ পরিবহনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ভাড়া দিয়ে পাওয়া অর্থ সিটি কর্পোরেশনের তহবিলে জমা না দেওয়ার অভিযোগ এবং পাঁচলাইশে দুটি দোকান বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করে। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও সেই তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি বলে যুগান্তর ও কালের সমাজ জানিয়েছে।
অভিযোগ ওঠার পর ২০২২ সালের ২৩ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগের এক আদেশে তাঁকে চট্টগ্রাম থেকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে বদলি করা হয় বলে যুগান্তর-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ওই তদন্তের ২২ মাস পরও ফলাফল প্রকাশ্যে আসেনি।
গাজীপুরে দায়িত্ব পালনকালেও সুদীপ বসাককে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ গণমাধ্যমে এসেছে। ২০২৬ সালে প্রায় ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি ডাস্টবিন নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র নিয়ে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
কালের সমাজ-এর ৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈধ দরদাতাদের মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল শাহরিশ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, যার দর ছিল প্রায় ২ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে দরপত্রে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা মেসার্স আব্দুর রহমান শাহ এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তাদের দর ছিল প্রায় ২ লাখ ৫১ হাজার টাকা বেশি।
এ নিয়ে সুদীপ বসাকের ভূমিকা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে কালের সমাজ জানিয়েছে, তিনি ওই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে চাননি। তবে একই প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে অন্য একটি অভিযোগের বিষয়ে। প্রায় ৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকার মশক নিধন রাসায়নিক কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে সুদীপ বসাক দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি তিনিই শনাক্ত করেছিলেন এবং তিনি কোনো আর্থিক সুবিধা নেননি।
অন্যদিকে বাংলা অ্যাফেয়ার্স-কে দেওয়া বক্তব্যে ডাস্টবিন প্রকল্পের বিষয়ে সুদীপ বসাক দাবি করেন, কাজটি ই-জিপি ও বিধি মেনেই হয়েছে। চট্টগ্রামে কর্মরত সময়ের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, সেসব বিষয়ে তাঁর জানা নেই।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সরকারি ওয়েবসাইটে বর্তমানে সুদীপ বসাককে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সরকারি তালিকায় তাঁর দপ্তর, পদবি ও অফিসিয়াল ই-মেইলও দেওয়া রয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে তাঁর ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে যোগদান এবং ২০২২ সালে গাজীপুরে বদলির তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
নাশিদ আহমেদ তুষারের অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, সুদীপ বসাকের চাকরির ইতিহাস নিয়ে চট্টগ্রামে আলোচনা ও গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর চাকরির ইতিহাস যথাযথভাবে যাচাই না করে তাঁকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে দায়িত্ব দেয়।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অভ্যন্তরে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাঁদের নামে বা বেনামে বিভিন্ন টেন্ডার ও কোটেশনে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব অভিযোগের পক্ষে অভিযোগকারী প্রয়োজনীয় সহায়ক কাগজপত্র পরে সরবরাহ করবেন বলে উল্লেখ করেছেন।
অভিযোগকারী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। পাশাপাশি অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি ও অন্যান্য সহায়ক প্রমাণ সরবরাহ করার কথাও উল্লেখ করেছেন।
সুদীপ বসাকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কিছু অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান হয়েছে, কিছু বিষয়ে সিটি কর্পোরেশন তদন্ত কমিটি করেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু এসব অভিযোগের প্রতিটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি, তদন্তের ফলাফল এবং দায় নির্ধারণের তথ্য প্রকাশ্যে নেই।
ফলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সুদীপ বসাকের প্রাথমিক নিয়োগ, ২০০৯ সালের চাকরি নিয়মিতকরণ, পরবর্তী পদোন্নতি এবং চট্টগ্রাম ও গাজীপুরে তাঁর দায়িত্ব পালনকালে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি নথি যাচাই করে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে কি না।
জনস্বার্থে এ বিষয়ে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত হলে অভিযোগ ও বাস্তবতার পার্থক্য স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে নিয়োগ ও পদোন্নতির নথি, স্থানীয় সরকার বিভাগের আদেশ, চসিকের তদন্ত প্রতিবেদন, দুদকের অনুসন্ধানের ফলাফল এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সাম্প্রতিক টেন্ডার নথি একসঙ্গে যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রচারিত অভিযোগের অবস্থানও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
কালের সমাজ/কে.পি

