বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে হারের রাতে আর্জেন্টিনা শুধু শিরোপাই হারায়নি, হারিয়েছে মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজকেও। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন তিনি। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে লাল কার্ড দেখা ষষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে নাম লেখান এনজো। তবে একই ম্যাচে আরও একজন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখতে পারতেন বলে মনে করেছিলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। সেই খেলোয়াড় স্পেনের লেফট ব্যাক মার্ক কুকুরেলা।
এনজো ফার্নান্দেজ প্রথমে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে হলুদ কার্ড দেখেন। প্রায় ১০ মিনিট পর স্পেনের ডিফেন্ডার পাউ কুবার্সির ওপর কঠোর ট্যাকল করলে রেফারি তাকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে মাঠের বাইরে পাঠান। এনজো মাঠ ছাড়ার পরপরই টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়ে মেসির প্রতিক্রিয়া। তিনি রেফারির দৃষ্টি আকর্ষণ করে কুকুরেলার দিকে ইঙ্গিত করেন এবং অভিযোগ করেন, স্প্যানিশ ডিফেন্ডার মুখ হাত দিয়ে ঢেকে কথা বলছেন।
সম্প্রতি ফুটবলে চালু হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মুখ ঢেকে কথা বলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সেই কারণেই মেসির দাবি ছিল, কুকুরেলার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
এই নিয়মটি চালুর পেছনে রয়েছে গত মৌসুমের একটি বিতর্কিত ঘটনা। বেনফিকার তরুণ মিডফিল্ডার জানলুকা প্রেস্তিয়ানির বিরুদ্ধে রিয়াল মাদ্রিদের ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের উদ্দেশে বর্ণবাদী মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছিল। তবে ওই সময় প্রেস্তিয়ানি মুখ ঢেকে কথা বলায় তার বক্তব্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সেই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে মুখ ঢেকে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করার বিষয়টি কঠোরভাবে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা।
এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের মিগুয়েল আলমিরন এবং ইকুয়েডরের পিয়েরো হিনক্যাপি একই ধরনের আচরণের দায়ে লাল কার্ড দেখেছেন। ফলে কুকুরেলার ঘটনাটি নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
তবে নিয়মটি শুধু মুখ ঢেকে কথা বলাকেই নিষিদ্ধ করেনি। ফিফার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো উত্তপ্ত পরিস্থিতি, তর্ক-বিতর্ক বা সংঘাতের সময় যদি কোনো খেলোয়াড় ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ঢেকে প্রতিপক্ষ, রেফারি বা অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেন, তখন সেটি অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং সরাসরি লাল কার্ড দেয়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, কেবল মুখে হাত রাখাই অপরাধ নয়; সেটি কোন পরিস্থিতিতে করা হয়েছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশ্বকাপে এর আগেও বেশ কয়েকজন ফুটবলারকে সাধারণ আলাপচারিতার সময় মুখে হাত দিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যাম ও ঘানার জর্ডান আইয়ুর কথোপকথনের সময়ও একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে কোনো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি না থাকায় রেফারি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি।
ফাইনালের ঘটনাটিও পর্যালোচনা করা হয়। সম্প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, কুকুরেলা মেসির দিকে হেঁটে গিয়ে কথা বলার সময় খুব অল্প সময়ের জন্য নিজের মুখ স্পর্শ করেন। তবে ভিডিওতে এমন কোনো আচরণ দেখা যায়নি, যা শত্রুভাবাপন্ন, অপমানজনক বা উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের ইঙ্গিত দেয়।
মেসির আপত্তির পর ম্যাচ কর্মকর্তারা ঘটনাটি বিবেচনায় নিলেও কুকুরেলার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাননি। যেহেতু ঘটনাটি নিয়ম ভঙ্গের পর্যায়ে পড়েছে এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হয়নি, তাই রেফারিরা তাকে সন্দেহের সুবিধা বা ‘বেনিফিট অব দ্য ডাউট’ দেন।
ফলে মুখ ঢেকে কথা বলার অভিযোগ উঠলেও স্পেনের এই ডিফেন্ডারকে লাল কার্ড দেখানো হয়নি। ফিফার বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, মুখে হাত দিয়ে কথা বলার চেয়ে সেটি কোন প্রেক্ষাপটে করা হয়েছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
কালের সমাজ/এসআর

