ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

বড়ালে নতুন করে দখল, দেখার কেউ নেই

জেলা প্রতিনিধি, রাজশাহী | সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম বড়ালে নতুন করে দখল, দেখার কেউ নেই

এক সপ্তাহে পাঁচ স্থানে আরসিসি ঢালাই দিয়ে স্থাপনা নির্মাণ, উচ্ছেদ হয়নি পুরোনো দখলদাররাও
রাজশাহী 

অস্তিত্ব সংকটে থাকা রাজশাহীর বড়াল নদীতে নতুন করে দখল শুরু হয়েছে। গত এক সপ্তাহে নদীর অন্তত পাঁচটি স্থানে আরসিসি ঢালাই দিয়ে ভবন ও দোকানঘর নির্মাণের কাজ চলছে। দিনের আলোয় প্রকাশ্যে নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও তা বন্ধে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে পুরোনো দখলদারদের উচ্ছেদ না হতেই নতুন করে নদী দখলের বিস্তার ঘটছে।

পদ্মা ও যমুনার সংযোগ রক্ষাকারী একসময়ের প্রবাহমান বড়াল এখন স্থানীয়ভাবে ‘মরা বড়াল’ নামেই বেশি পরিচিত। দখল ও দূষণে নদীর অনেক অংশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নদীর উৎসমুখ পদ্মা-বড়ালের মোহনা এলাকায় দুই তীর দখল করে গড়ে উঠেছে আবাসিক ভবন, পৌরসভার মার্কেট, গণশৌচাগারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। কোথাও কোথাও নদীর ভেতরেও নির্মাণ করা হয়েছে স্থাপনা।

বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বড়াল নদীর শিমুলিয়া, পুঠিমারি ও বাটিকামারী এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর জায়গায় নতুন করে নির্মাণকাজ চলছে। কয়েকটি স্থানে আরসিসি ঢালাই দিয়ে ভবনের ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। কোথাও আবার ঢালাইয়ের রড বের করে রাখা হয়েছে, যাতে পরবর্তী সময়ে ভবনের পরিধি আরও বাড়ানো যায়।

শিমুলিয়া এলাকায় নদীর ভেতরে আরসিসি ঢালাই দিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন স্থানীয় মিনারুল ইসলাম। ভবনের পরিধি বাড়ানোর জন্য ঢালাইয়ের রডও বের করে রাখা হয়েছে। নদী দখল করে নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে মিনারুল ইসলাম বলেন, ‘কত মানুষই তো ঘরবাড়ি করেছে। কতজনকে বাধা দিয়েছেন? পুরোটা নদীর জায়গা নয়।’

তবে স্থানীয় বাসিন্দা মখলেসুর রহমান বলেন, পুরো জায়গাটিই নদীর। সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও ভবন করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয়রা বাধা দিলেও তা মানা হয়নি।

পুঠিমারি-বাটিকামারী এলাকায় নদীর জায়গায় চা দোকান করতেন রবিউল ইসলাম। এখন সেখানে তাঁর ছেলে আল আমিন আরসিসি ঢালাই দিয়ে দুই কক্ষের ঘর নির্মাণ করছেন। একটি কক্ষ ভাড়া দেওয়ার এবং অন্যটিতে নিজেদের দোকান করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল ওহাব বলেন, ‘জায়গাটি নদীর। চা বিক্রি করতে করতে এখন ঘর তৈরি করছে। এভাবে দখল হতে থাকলে নদীর পাড় বলে কিছুই থাকবে না।’

তবে আল আমিনের দাবি, জায়গাটি তাঁদের নিজস্ব। নদীর জায়গায় নয়, নিজেদের জমিতেই ঘর নির্মাণ করছেন তিনি।

পুঠিমারি এলাকায় কিছুদিন আগে নদীর জায়গা দখল করে দোকানঘর নির্মাণ করেছেন স্থানীয় ইমদাদুল ইসলাম ও আব্দুর রহমান। তাঁদের ভাষ্য, অনেকেই নদীর পাশে দোকান করেছেন, তাঁরাও করেছেন। সব জায়গা নদীর নয়। সরকারি জায়গা হলে সরকার চাইলে তখন ব্যবস্থা নেবে।

উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, বড়াল নদীর দখলদার উচ্ছেদে গত দুই দশকে একাধিকবার তালিকা করা হয়েছে। ২০০৫ সালে নদীর দুই পাড়ের ৬৮ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা করা হয়। ২০০৮ সালে হালনাগাদ করে দখলদারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৩ জনে। ২০১৯ সালে সরেজমিন তদন্তে ৫৬ জন এবং ২০২৫ সালে ১০১ জন দখলদারের তালিকা করা হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের মে মাসে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশে হালনাগাদ করা তালিকায় ১১০ জন দখলদারের নাম পাঠানো হয়েছে।

সর্বশেষ তালিকা যাচাই করে দেখা গেছে, চারঘাট স্লুইসগেট এলাকায় ২৯ জন, সরদহে ৩ জন, বাটিকামারীতে ২৫ জন এবং আড়ানী বড়াল সেতু সংলগ্ন রামচন্দ্রপুর এলাকায় ৫৪ জন দখলদার রয়েছেন। তবে সম্প্রতি নদীর জায়গায় নতুন করে স্থাপনা নির্মাণকারীদের অনেকের নাম ওই তালিকায় নেই।

এমনকি নদীর জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ থাকা চারঘাট পৌরসভা এবং নদীর ভেতরে বৃক্ষরোপণ করা বন বিভাগের নামও দখলদারের তালিকায় নেই।

স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিবার তালিকা হালনাগাদের পর দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) প্রধান করে উচ্ছেদ কমিটিও গঠন করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক চাপসহ নানা কারণে শেষ পর্যন্ত উচ্ছেদ কার্যক্রম এগোয়নি। ফলে পুরোনো দখলদারদের উচ্ছেদ তো হয়ইনি, বরং নতুন করে নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা বেড়েছে।

বড়াল রক্ষা আন্দোলনের নেতাকর্মী ও পরিবেশকর্মীদের দাবি, সরকারি তালিকায় দখলদারের সংখ্যা শতাধিক হলেও বাস্তবে এ সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। নদীর তীর ও নদীর ভেতরে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন স্থাপনা তৈরি হচ্ছে।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, ‘নদী দখলকারীদের তালিকা করে উচ্ছেদ করা তো দূরের কথা, নতুন যারা দখল করছে তাদের বাধা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না। তাহলে এসব তালিকা করে লাভ কী? সরকারি হিসাবে দখলদার শতাধিক হলেও বাস্তবে সংখ্যা চার শতাধিক।’

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ সরকার বলেন, দখলদারের সংখ্যা ১১০ জনের চেয়ে বেশি। পর্যায়ক্রমে সব দখলদারই তালিকায় আসবে। উচ্ছেদ কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে কাজ চলছে এবং খুব দ্রুত কার্যক্রম শুরু হবে। নতুন করে যারা দখল করছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চারঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মীর মেজবাহীজ্জুলাম চৌধুরী বলেন, ‘নতুন দখলকারীদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 

গ্রাম-গঞ্জ বিভাগের আরো খবর

Link copied!