নদীমাতৃক বাংলাদেশের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক গভীর। নদী যেমন ভাঙে, তেমনি গড়ে; কখনো কেড়ে নেয় বসতভিটা, আবার কখনো বয়ে আনে জীবিকার নতুন সম্ভাবনা। মাগুরার মহম্মদপুরে মধুমতি নদীর তীরে বর্ষা-শরতের এমনই এক চিত্র চোখে পড়ে-বাঁশ ও নাইলনের জালে ইলিশ ধরার ব্যতিক্রমী আয়োজন। মধুমতিতে স্রোত বাড়লে ঘোলা পানির স্রোত কেটে উজানে ছুটে চলে রুপালি ইলিশ। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নদীর তীরে বাঁশ পুঁতে স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয় বিশেষ ধরনের ‘ওড়ং জাল’। কোথাও এটি ‘দাড় জাল’ নামেও পরিচিত। দীর্ঘ বাঁশের কাঠামোর সঙ্গে জালটি এমনভাবে বসানো হয়, যাতে ভাটির দিকে টেনে নেয়ার সময় উজানমুখী মাছ জালে আটকা পড়ে।
মহম্মদপুরের কাশিপুর, বসুরধুলজুড়ী, বঙ্গেশ্বর, ভোলানাথপুর ও রুইজানী এলাকার কয়েকটি স্থানে এ পদ্ধতিতে মাছ ধরার দৃশ্য দেখা যায়। স্থানীয়রা জানান, প্রায় ১৪-১৫ জনের নিজস্ব ওড়ং জাল রয়েছে। এসব জাল ব্যবহার করে বিভিন্ন সময়ে ৪০-৪৫ জনের মতো মানুষ শখের বশে ইলিশ ধরতে নদীর তীরে আসেন। রায়পুর গ্রামের মাসুম শেখ, ইসলাম শেখ, মোর্তজা শেখ, বঙ্গেশ্বর গ্রামের ইকরামুল এবং বসুরধুলজুড়ী গ্রামের ফুল মিয়া ও চুন্নু শেখ প্রতিদিনই ওড়ং জাল দিয়ে ইলিশ মাছ ধরেন।
বসুরধুলজুড়ী গ্রামের ৬০ বছর বয়সী ফুল মিয়া প্রায় ৩৭-৩৮ বছর ধরে এভাবে মধুমতিতে ইলিশ ধরছেন। তাঁর ভাষায়, “মাছ ধরাটা মূলত শখের; তাজা ইলিশ জালে উঠলে আনন্দটাই বড়।” রায়পুর গ্রামের ৫০ বছর বয়সী মোর্তজা শেখও নিয়মিত আসেন। তাঁর কথায়, “মাছ বেশি পাওয়া যায় না। দুই-চারটি মাছ পেলেই নিজেদের খাওয়া চলে, আত্মীয়দেরও দেয়া হয়।” মধুমতির ভাঙন, স্রোত আর অনিশ্চয়তার মাঝেও তাই ওড়ং জাল ঘিরে টিকে আছে মানুষের শখ, পারস্পরিকতা এবং নদীকেন্দ্রিক এক পুরোনো লোকজ ঐতিহ্য।
কালের সমাজ/কে.পি

