বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মননশীল চিন্তার অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই। রোববার রাজধানীর মিরপুরের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। পরিবারের পক্ষ থেকেও তাঁর পুত্রবধূ রাজিয়া রহমান মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জানা গেছে, রোববার দুপুরে মিরপুরের একটি রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে গিয়েছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। সেখানে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাহিত্যিক, শিক্ষক, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে তাঁকে স্মরণ করে লিখেছেন, বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধির চর্চা, বাংলা ভাষার বিকাশ এবং জাতীয় চিন্তার জগতে তিনি ছিলেন এক অনন্য পথপ্রদর্শক। ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণকারী অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক শৈশব থেকেই ছিলেন জ্ঞানপিপাসু ও অধ্যবসায়ী। উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষকতা এবং গবেষণাকে জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর চিন্তার পরিধি কেবল সাহিত্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ইতিহাস, দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা, সমাজবিজ্ঞান ও সংস্কৃতিও ছিল তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
দীর্ঘ কয়েক দশক তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন কঠোর শৃঙ্খলাবোধসম্পন্ন, অথচ অত্যন্ত আন্তরিক। শিক্ষার্থীদের মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে বিশ্লেষণধর্মী ও স্বাধীন চিন্তার অনুশীলনে উৎসাহিত করতেন। তাঁর ক্লাসে সাহিত্য আলোচনার পাশাপাশি ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও দর্শনের নানা প্রসঙ্গ উঠে আসত। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে তিনি ছিলেন কেবল একজন শিক্ষক নন, বরং একজন চিন্তার দিশারী।
শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাহিত্যসমালোচক ও সমাজচিন্তক। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২০টিরও বেশি। ভাষা আন্দোলন, রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, জাতীয়তাবাদ, শিক্ষা এবং সমাজচিন্তা নিয়ে তাঁর রচনাগুলো বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন, রাজনীতি দর্শন, সাহিত্য চিন্তা, সংস্কৃতির সহজ কথা’ সহ আরও বহু গবেষণাগ্রন্থ ও প্রবন্ধসংকলন। এছাড়া তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং স্বদেশচিন্তা গ্রন্থ দুটি গবেষক ও পাঠকমহলে বিশেষভাবে সমাদৃত। অধ্যাপক ফজলুল হকের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ, ইতিহাসবোধ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি সাহিত্যকে সমাজের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি। তাঁর মতে, সাহিত্য মানুষের চেতনা গঠন, সমাজের সংকট বিশ্লেষণ এবং জাতীয় আত্মপরিচয় নির্মাণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং অন্যান্য সাহিত্যিকের সাহিত্য নিয়ে যেমন তিনি গভীর বিশ্লেষণ করেছেন, তেমনি বাংলাদেশের শিক্ষা, রাজনীতি, গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয় নিয়েও লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ।
দর্শনচিন্তার ক্ষেত্রেও তাঁর স্বাতন্ত্র্য ছিল স্পষ্ট। তিনি মনে করতেন, একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে মুক্তচিন্তা, বৈজ্ঞানিক মনন এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশের ওপর। অন্ধ অনুসরণ বা সংকীর্ণতার পরিবর্তে যুক্তিবাদী ও সমালোচনামূলক চিন্তাকে তিনি সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর লেখায় দেশীয় বাস্তবতার আলোকে জাতীয় উন্নয়নের পথ অনুসন্ধানের আহ্বান বারবার উঠে এসেছে। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার আন্দোলনেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্রশাসন, শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার কার্যকর প্রয়োগের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, ভাষানীতি এবং মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে তাঁর গবেষণা ও লেখালেখি আজও প্রাসঙ্গিক।
বাংলা একাডেমির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং একসময় সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে বাংলা একাডেমির ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে তিনি নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
সাহিত্য ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। এই সম্মাননা তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যসাধনা ও গবেষণাকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি লেখালেখি, গবেষণা এবং জাতীয় বিভিন্ন বিষয়ে মতামত প্রদানের মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে সক্রিয় ছিলেন।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রয়াণে বাংলাদেশ হারাল এমন একজন মনীষীকে, যিনি জ্ঞানচর্চাকে কেবল পেশা নয়, জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে দেখতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি শিক্ষিত, মানবিক ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের জন্য ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শনের চর্চা অপরিহার্য।
তাঁর রেখে যাওয়া গ্রন্থ, গবেষণা, প্রবন্ধ এবং চিন্তার উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও জাতীয় চিন্তার ইতিহাসে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের নাম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। তাঁর প্রয়াণে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
কালের সমাজ/এএইচবি

